আকালের দিনে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব

রফিক রাফি

জাতীয়

সংকটের মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে

2026-08-01T01:04:44+00:00
2026-08-01T01:04:44+00:00
 
  শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
গ্যাস সংকট
আকালের দিনে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব
রফিক রাফি
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১:০৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সংকটের মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। এ ছাড়া শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে গেল সপ্তাহে পাঠানো চিঠিতে।

পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে সিএনজির দাম ৪৩ থেকে প্রায় ৬৫ টাকা করা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ থেকে ২৫ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দামও বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্র থেকে সময়ের আলোকে এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানি খরচ এখন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে যে টাকা দিয়ে ২ কার্গো এলএনজি আমদানি করা যেত এখন সেই টাকা দিয়ে এক কার্গোর কিছু বেশি এলএনজি পাওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে অনেক ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এখন তারা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে বিইআরসিতে পাঠানো হবে। তারপর গণশুনানির মাধ্যমে বিইআরসি সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্র জানায়, কাগজে-কলমে লাভ দেখালেও প্রতিটি বিতরণ কোম্পানির এখন লোকসান হচ্ছে। এ জন্য তারা সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর আবেদন করেছে। এটা যৌক্তিক। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের চাইতে গ্যাসের দাম কম অথচ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বেশি। দাম বৃদ্ধি করে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আনা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সিএনজি স্টেশন মালিকরাও কমিশন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।

পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাহিদার চেয়ে সরবরাহে ১ হাজার ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকে। সরবরাহ বাড়াতে হলে আমদানি বাড়াতে হবে, তখন ভর্তুকিও বাড়বে। ফলে আজ না হোক কাল দাম বাড়াতেই হবে। এ ক্ষেত্রে সিএনজি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাস এবং শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আবাসিকে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে বাধ্য হয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গেল সপ্তাহে দেওয়া পেট্রোবাংলার প্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও যৌক্তিকতা নিরূপণ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ মহল সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। নীতিগত সিদ্ধান্ত পজিটিভ হলে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসিতে পাঠানো হবে।

অন্যদিকে বিতরণ কোম্পানিগুলোও জুলাই মাসে পেট্রোবাংলার কাছে বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সবচেয়ে কম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি। তারা ২৪ পয়সা থেকে ৪১ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে।

এ ছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বর্তমান ৩৭ পয়সার পরিবর্তে ১ টাকা ২১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা করার আবেদন করেছে।

চলতি সপ্তাহে চালু হবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল
মহেশখালীতে আগুনে পুড়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত করে এখনও গ্যাস সরবরাহ উপযোগী করা সম্ভব হয়নি। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এতে সারা দেশে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটের মধ্যেই দাম বৃদ্ধির খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে পেট্রোবাংলা বলছে, চলতি সপ্তাহেই গ্যাসের সংকট কেটে যাবে। আগামী ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে টার্মিনালটির একটি ইউনিট চালু হবে, তখন ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। তার পরের সপ্তাহেই ২টি ইউনিট থেকে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিদেশি কোম্পানি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির মেরামতে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। কারণ ছোট ঘটনা থেকে বড় দুর্ঘটনা হয়ে গেলে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ জন্য মেরামতে সময় বেশি লাগছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। এখন দেশীয় চাহিদার ৭০ শতাংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আর বাকি ৩০ শতাংশ গ্যাস এলএনজি আমদানি করে মেটানো হচ্ছে। আমদানিতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। 

বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দিন দিন দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন কমছে। আগামী কয়েক বছরে আমদানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে এমন পূর্বাভাস রয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশি উৎস থেকে কেনা দামের কাছাকাছি দাম নির্ধারণ করে সরকারের ভর্তুকি কমানোর বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক বছর ধরেই আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম বৃদ্ধি করে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দেয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন এর জের টানতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে জ্বালানি খাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো সাময়িক মলম বা ব্যান্ড-এইড সলিউশন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা- উভয়ই এখন বড় চ্যালেঞ্জে। ভবিষ্যতে শিল্পায়নের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে মোবাইলে ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, গত ১৫ বছরের সমস্যা বর্তমান সরকারের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা না করে এলএনজি আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে দেশকে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

প্রসঙ্গত এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং একই বছরের নভেম্বরে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা করা হয়েছিল।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: