ইরানে স্থলপথ অবরোধ ও টানা বোমা হামলার ছক

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানকে কোণঠাসা করতে এবার দেশটির ওপর স্থলপথে অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। একই সঙ্গে ইরানে টানা ১৪ দিন

2026-08-01T03:54:46+00:00
2026-08-01T03:54:46+00:00
 
  শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানে স্থলপথ অবরোধ ও টানা বোমা হামলার ছক
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ইরানকে কোণঠাসা করতে এবার দেশটির ওপর স্থলপথে অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। একই সঙ্গে ইরানে টানা ১৪ দিন বোমাবর্ষণের পরিকল্পনাও করছে মার্কিন বাহিনী। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের দুটি প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা কয়েক মাসের বিমান হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালিয়েও ইরান সরকারকে নতি স্বীকার করাতে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ‘স্থলপথ অবরোধ’ অন্যতম একটি বিকল্প হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার বৈঠকে ‘সামরিক ও বেসামরিক’ দুই ভাবেই ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ইরানের প্রতিবেশী দেশ এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এর মাধ্যমে ইরানের সীমান্ত পারাপারগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে, যাতে দেশটির আমদানি-রফতানি প্রবাহ পুরোপুরি থমকে যায়।

আলোচনার বিষয়ে একজন জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘যদি আমরা স্থলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিই এবং ইরান কোনো কিছু ভেতরে আনতে বা বাইরে নিতে না পারে, তবে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে।’ অবশ্য এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাকে ‘প্রায় অসম্ভব’ বলে মনে করছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শন ম্যাকফারল্যান্ড। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি ইরানের বাণিজ্য করার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেন, তবেই তাদের অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। আর এটিই হবে তাদের হাঁটু গেঁড়ে বসাতে বাধ্য করার একমাত্র উপায়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই অর্থনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি অবশ্যই সামরিক উপাদান থাকতে হবে। তবে সমস্যা হলো- ইরানের অনেক প্রতিবেশী দেশ রয়েছে এবং ইরাকের মতো দেশ সরাসরি ইরানের মিত্র। ফলে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেশটিতে পৌঁছানো বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হবে।’

স্থলপথ অবরোধের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে ইনচে বরুন এবং সারাখস-সারাখসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারগুলো, যা ইরানকে তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরানের মোট সাতটি দেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পকে এখন এই সাতটি দেশকে সহযোগিতার জন্য রাজি করাতে হবে, যাদের অনেকের সঙ্গেই তাদের কোনো মিত্রতা নেই। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে বিশেষ করে পাকিস্তান ও ইরাককে এই পরিকল্পনার ‘দুর্বল যোগসূত্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আবার এই দেশগুলোর কোনোটি যদি সহযোগিতা করতে রাজিও হয়, তবে তাদের নিজেদেরও অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ইরানের পাল্টা হামলার হুমকির মুখে পড়তে হবে।

বন্দর বা সীমান্ত অবরোধ ইরানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টাতেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ইরান বর্তমানে চীনের কাছ থেকে কয়েকশ রকেট লঞ্চার পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এই সামরিক চুক্তির মূল্য প্রায় ৭ কোটি ডলার, যার আওতায় কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার কথা তেহরানের। এ ছাড়া চীনের জাহাজগুলো প্রায়ই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাস এবং চাবাহার বন্দরে ভিড়ে থাকে।

সূত্রমতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করছেন হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বর্তমান কৌশলে তিনি শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। তাই তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে বাধ্য করতে সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর বিভিন্ন পথ খুঁজছেন। স্থলপথ অবরোধ মূলত তার সেই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ কৌশলেরই অংশ, যা নৌ-অবরোধের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।

তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি হয়তো ইরানকে বিভ্রান্ত করার কোনো কৌশল হতে পারে, যাতে তেহরান তাদের পরবর্তী আসল পদক্ষেপ সম্পর্কে আঁচ করতে না পারে। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে বর্তমানে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ অর্থনৈতিক ধস নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, অন্য পক্ষ মনে করছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত। ইসরাইলি সূত্র দাবি করেছে, ইরানের ভেতরে বর্তমানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং ডিজেল নেওয়ার জন্য পাম্পগুলোতে মানুষের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বৈঠকটিকে সংশ্লিষ্টরা অত্যন্ত ‘ইতিবাচক ও বন্ধুত্বপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একজন ইসরাইলি কর্মকর্তা জানান, তারা তিনটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন- একটি চুক্তিতে পৌঁছানো, নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং আবারও বিমান হামলা শুরু করা। নেতানিয়াহু কোনো নির্দিষ্ট একটি বিকল্পের ওপর জোর দেননি। 

তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল নিজেদের জীবন নয়, আপনাদের জীবনও রক্ষা করছি। আমরা মূলত বর্বরতাসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে সভ্যতার যুদ্ধ লড়ছি।’ বৈরিতার প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা যাচ্ছে, পাঁচ দিনের শান্তির পর গত মঙ্গলবার রাতে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের এক ‘আকস্মিক’ হামলার জেরে বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘ব্যাপক বিমান হামলা’ চালিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা সংক্ষিপ্ত বার্তায় জানিয়েছেন, ‘কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে এখন সব বিকল্পই খোলা রয়েছে।’

দ্য টেলিগ্রাফের আরেক প্রতিবেদন বলছে, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ইরানের ওপর টানা দুই সপ্তাহ বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক শীর্ষ মার্কিন কমান্ডার। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র‍্যাড কুপার এই পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে, তখন তেহরানের লড়াইয়ের সক্ষমতা নির্মূল করতে এই ১০ থেকে ১৪ দিনের হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের আকস্মিক হামলার পর ইরানে ফের হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। সেন্টকমের দাবি, মার্কিন বাহিনী ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সামরিক কমান্ড সেন্টারসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ইরনা জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের বেশ কয়েকটি শহরের পাশাপাশি কেশম দ্বীপেও হামলা করা হয়েছে। হামলায় হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে তিনজন নিহত হয়েছেন। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি ইরানে কড়া আঘাত হানবেন এবং ‘তাদের উচিত শিক্ষা দেবেন’। তার এই হুমকি উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়াই ইঙ্গিত দেয়।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানে এই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত করছেন অ্যাডমিরাল কুপার। ফ্লোরিডার টাম্পায় নিজের প্রধান কার্যালয় থেকে তিনি এই যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুদ যে ফুরিয়ে আসছে, সেই সতর্কবার্তাকেও আমলে নেওয়া হচ্ছে না এই পরিকল্পনায়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   ইরান  স্থলপথ  অবরোধ  বোমা  হামলার ছক 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: