পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত উপত্যকায় একটি পুলিশ স্টেশনের সামনে আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন। রোববার (২ আগস্ট) সন্ধ্যায় কাবাল শহরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার সময় সেখানে সহিংসতা বৃদ্ধির প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ করছিলেন।
জেলা পুলিশ কর্মকর্তা (ডিপিও) উমর খান জানান, আত্মঘাতী হামলাকারী কাবাল পুলিশ স্টেশনের প্রবেশমুখে পৌঁছালে পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে তল্লাশি করার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক বিস্ফোরণ ঘটান। বিস্ফোরণের তীব্রতায় পুলিশ স্টেশনের সামনের এলাকা এবং পাশেই চলমান সমাবেশে থাকা লোকজন হতাহত হন।
সোয়াত অঞ্চলের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) ফিদা হুসেইন জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের নিকটবর্তী সাইদু শরিফ শহরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং তদন্ত শুরু করে। এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ সমাবেশে শেষ বক্তা বক্তব্য দেওয়ার সময়ই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মুহূর্তেই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা সাম্প্রতিক সময়ে সোয়াতে সশস্ত্র হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ওই সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ বাসিন্দাদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এক বক্তা পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডনকে বলেন, আমরা বছরের পর বছর রক্তপাত দেখেছি। আরেকটি প্রজন্মকে এতিম ও বিধবা হতে দেখতে চাই না।
হামলার নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। পৃথক বিবৃতিতে তারা নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তারা বলেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সেখানে সরকারবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ২০০৯ সালের সামরিক অভিযানের পর সংগঠনটি সোয়াত থেকে পিছু হটলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এই হামলার মাত্র তিন দিন আগে হাঙ্গু জেলায় বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন ব্যবহার করে একটি পুলিশ চৌকিতে হামলায় ১১ পুলিশ সদস্য নিহত হন। এরও আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে ট্যাংক জেলায় গাড়িবোমা হামলায় ২৭ সেনাসদস্য নিহত হন। ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল টিটিপি।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ১৫৪ জন নিহত হয়েছেন, যা জুন মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার সীমান্তের ওপারে অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে হামলার পরিকল্পনা করে। তবে কাবুল এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
এই ইস্যুতে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালায়। কাবুল ও জাতিসংঘের দাবি, ওই হামলায় কয়েক ডজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়।
সময়ের আলো/কেএইচ