ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানলের মধ্যে গ্রিসে আগুন নেভানোর অভিযানে অংশ নেওয়া দুটি অগ্নিনির্বাপণ হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের একজন গ্রিসের এবং অন্যজন ডেনমার্কের নাগরিক। অন্য হেলিকপ্টারে থাকা গ্রিস ও যুক্তরাজ্যের দুই আরোহী প্রাণে বেঁচে গেছেন। এদিকে ফ্রান্সে বাতাসের দিক পরিবর্তন হওয়ায় একটি বড় দাবানল নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (২ আগস্ট) এথেন্সের উত্তর-পশ্চিমে অ্যাটিকা অঞ্চলের পসাথা এলাকায় দাবানল নিয়ন্ত্রণের সময় আকাশে দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হয়। গ্রিসের ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নিচ দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি হেলিকপ্টারের মূল রোটর ওপরের হেলিকপ্টারের নিচের অংশে আঘাত করলে সেটি আগুন ধরে ভূপাতিত হয়। তবে রয়টার্স ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এথেন্সের উত্তর-পশ্চিমে ভয়াবহ দাবানলে ইতোমধ্যে ১০০টির বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে পর্যটন দ্বীপ কেফালোনিয়াতেও নতুন দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় কয়েকটি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গ্রিক সংবাদমাধ্যম ই-কাথিমেরিনি জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বোয়োতিয়া অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া আগুনের উৎস ছিল বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মূল বিদ্যুৎ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী একটি বেসরকারি বিদ্যুৎ লাইনের তার থেকে ছিটকে পড়া স্ফুলিঙ্গ। এ ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে দুই গ্রিক নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও একজন সন্দেহভাজন পলাতক রয়েছেন।
করিন্থ উপসাগরের তীরবর্তী পোর্তো জারমেনো এলাকায় ঝোড়ো বাতাস কিছুটা কমলেও আগুন পাহাড় পেরিয়ে দক্ষিণে ভেনিজা বসতি ও একটি সামরিক ফায়ারিং রেঞ্জে পৌঁছে যায়। সেখানে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদেও আগুন লাগে। প্রায় ৩০ হাজার জনসংখ্যার উপকূলীয় শহর মেগারার দিকে আগুনের বিস্তার ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস বলেন, প্রকৃতির শক্তি এবং আবহাওয়ার তীব্রতা অনেক সময় মানুষের সব পরিকল্পনা ও সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়।
অ্যাজিওস কনস্টান্টিনোস গ্রামের বাসিন্দারা নিজেরাই পানি ঢেলে আগুনের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। ৬১ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা তাসোস তজেমপেলিকোস বলেন, গত রাত থেকেই আগুন জ্বলছে। সব জায়গায় অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী থাকা সম্ভব নয়। তাই আমরা বাসিন্দারাই যা পারছি করছি।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভার অঞ্চলে বাতাসের দিক পরিবর্তন হওয়ায় একটি বড় দাবানল দুর্গম বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিক শহর কারকাসনের কাছে একটি মহাসড়কের পাশে জ্বলন্ত একটি যানবাহন থেকে নতুন আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ মহাসড়কটি বন্ধ করে দিয়েছে এবং কাছের একটি প্রাণী উদ্যান খালি করে দিয়েছে।
ভার অঞ্চলের মনফোর-সুর-আরজঁস শহরের বাসিন্দা জর্জ ব্ল্যাঙ্ক আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার পর বাড়িতে ফিরে অঙ্গার নিভিয়ে পুনরায় আগুন লাগা ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও দমকলকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এলাকাটির বাড়িগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
স্পেনের মধ্যাঞ্চলে গত সপ্তাহে হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়িয়ে দেওয়া দাবানলের বেশিরভাগই এখন নিয়ন্ত্রণে এলেও কয়েকটি এলাকায় আবার আগুন জ্বলে উঠেছে। কাসেরেস প্রদেশে নতুন দাবানলের কারণে সরিয়ে নেওয়া প্রায় ৮০০ বাসিন্দাকে ঘরে ফিরতে দেওয়া হয়েছে, তবে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় তাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপের তীব্র খরা ও নদীর পানি কমে যাওয়ায় নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। ড্যানিউব নদীর পানির স্তর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো বন্ধ করতে হয়েছে।
এছাড়া হাঙ্গেরির শতাধিক শহর ও গ্রামে পানির ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। একই কারণে নৌপরিবহন ও পর্যটনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সার্বিয়ায়ও ড্যানিউব নদীর পানির স্তর ১৯৮৫ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় দেশটির সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।
সময়ের আলো/কেএইচ