পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিক থেকে ব্রিটিশ-নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজার মরদেহ। রোববার (২ আগস্ট) আলপাইন ক্লাব অব পাকিস্তান জানিয়েছে, পাহাড়ের প্রায় ৫,৭০০ মিটার উঁচুতে পুরজার মরদেহ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার ৪৩ বছর বয়সী এই পর্বতারোহীর মৃত্যুর খবর জানায় তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ‘এলিট এক্সপিডিশনস’। তারা জানায়, ভয়াবহ তুষারধসের ঘটনায় প্রাণ হারানো ১০ জনের মধ্যে পুরজা ছিলেন। তার এই প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রিন্স অব ওয়েলসসহ বিশিষ্টজনেরা।
নির্মল পুরজার জন্ম নেপালে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে। তিনি ২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাসেরও কম সময়ে বিশ্বের ১৪টি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
আলপাইন ক্লাব জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো একটি গ্রাউন্ড টিমের মাধ্যমে জাপানি ক্যাম্পে নামিয়ে আনা হবে।
নির্মল পুরজার মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের আগেই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, তার নেতৃত্বাধীন অভিযানের আরও তিন পর্বতারোহীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন আমেরিকার ম্যালোরি গেইস, ওমানের নাদিরা আহমেদ আবদুল্লাহ আল হারথি এবং নেপালের পুর বাহাদুর গুরুং।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এক শোকবার্তায় বলেন, পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় বিশ্ব রেকর্ডধারী নির্মল পুরজা সহ ছয়জন নেপালি এবং চারজন বিদেশি পর্বতারোহীর এই ট্র্যাজিক মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, তাদের সাহস, আত্মনিবেদন এবং অবদান ইতিহাসের পাতায় সবসময় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
এক শোকবার্তায় নির্মলের বড় ভাই কমল লিখেছেন, আমার প্রিয় ছোট ভাই নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজা এবং অন্য পর্বতারোহীরা আর আমাদের মাঝে নেই।
প্রিন্স উইলিয়াম বলেছেন, নির্মল পুরজার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি স্মরণ করেন যে, পুরজা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ‘অসামান্য নিষ্ঠার সাথে’ দায়িত্ব পালনের পর ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।
এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং লিখেছেন, নির্মল (নিমস) পুরজা এবং তার সাথে থাকা অন্যান্য পর্বতারোহীদের মৃত্যুল সংবাদটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
তিনি আরও বলেন, পুরজা একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ ছিলেন, যিনি দীর্ঘ বছর আমাদের সশস্ত্র বাহিনীতে সেবা দিয়েছেন— আর বিশ্বজুড়ে পর্বতারোহণের রোমাঞ্চকর অভিযানের কথা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
উদ্ধার কাজের সঙ্গে যুক্ত আলপাইন ক্লাবের মুখপাত্র নাইলা কিয়ানি জানান, তাদের আশঙ্কা দলের সব সদস্যই মারা গেছেন। পুরজার নেতৃত্বে এর আগেও অনেক অভিযানে অংশ নিয়েছেন তিনি।
তার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে নাইলা তাকে ‘অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং নির্ভীক একজন পর্বতারোহী’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
কারাকোরাম পর্বতমালার ৮ হাজার ৪৭ মিটার (২৬ হাজার ৪০০ ফুট) উঁচু ব্রড পিকে গত বৃহস্পতিবার তুষারধসের ঘটনা ঘটে। বিশ্বের ১২তম সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গে এরপর থেকেই নিখোঁজ পর্বতারোহীদের খুঁজছেন পাকিস্তানের উদ্ধারকারী দলগুলো।
বহুজাতিক এই পর্বতারোহী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন পুরজা। ২০১৯ সালে আট হাজার মিটারের বেশি উঁচু বিশ্বের ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ মাত্র ১৮৯ দিনে জয় করেন তিনি। আগের রেকর্ডটি ৭ বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে ভেঙে দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন।
দুই বছর পর তার এই অভিযানের ওপর ভিত্তি করে নেটফ্লিক্সে একটি প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায়। ‘১৪ পিকস : নাথিং ইজ ইমপসিবল’ নামের ওই প্রামাণ্যচিত্রটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
সে সময় তিনি বলেছিলেন, এই ছয় মাস ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর, তবে একই সঙ্গে বিনয়ী করে তোলার মতো এক অভিজ্ঞতা। আমি আশা করি, এই অভিযানের মাধ্যমে আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে, একাগ্রতা, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মনোভাব থাকলে যেকোনো কিছুই সম্ভব।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ১৬ বছর কাজ করেছেন নির্মল পুরজা। এর মধ্যে ১০ বছরই তিনি ছিলেন স্পেশাল ফোর্সে। চরম উচ্চতায় পর্বত আরোহণে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ২০১৮ সালে প্রয়াত রানি তাঁকে সম্মানসূচক ‘এমবিই’ খেতাবে ভূষিত করেন।
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারে স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে থাকতেন নির্মল পুরজা। তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় এভারেস্ট জয় করা প্রথম গুর্খাও তিনি।
গত সোমবার এক্সে দেওয়া নিজের সর্বশেষ পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রড পিকে আরোহণের কোনো পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না।
কারাকোরাম পর্বতমালার আরেকটি শৃঙ্গ গাশারব্রুম-২ এর কথা উল্লেখ করে পুরজা লিখেছিলেন, ‘=প্রাথমিকভাবে শুধু জি-২ (গাশারব্রুম-২) আরোহণের পরিকল্পনা ছিল।
তবে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার ঠিক আগে তিনি একটা বিষয় বুঝতে পারেন। তিনি ভাবেন, এই সুযোগে ব্রড পিক জয় করতে পারলে তাঁর সামনে আর মাত্র একটি পর্বত বাকি থাকবে। সেটি করতে পারলেই তিনি ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ‘বিনা অক্সিজেনে আট হাজারি ১৪টি শৃঙ্গ দুবার জয়ের’ অনন্য রেকর্ড গড়বেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার মিটারের বেশি উঁচু পর্বতগুলোকে ‘আট হাজারি শৃঙ্গ’ বলা হয়।
পুরজা আরও লিখেছিলেন, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। তবে সুযোগ কখনো চিৎকার করে আসে না; বরং যারা নীরবে কাজ করে যায়, সুযোগ তাদের কানে কানে কথা বলে।’
ওই পোস্টে তিনি লেখেন, ব্রড পিক, আমি শুধু নিরাপদে ওপরে ওঠা আর নিচে নেমে আসার পথটুকু চাই। কোনো পর্বতকেই আমি হালকাভাবে নিই না।
পর্বতারোহীদের কাছে ব্রড পিক অন্যতম কঠিন একটি পর্বত হিসেবে বিবেচিত। ১৯৫৭ সালে অস্ট্রিয়ার একটি অভিযাত্রী দল প্রথমবারের মতো এই চূড়াটি সফলভাবে জয় করে। এরপর থেকে অনেকেই এই পর্বত জয় করেছেন। তবে প্রাণও হারিয়েছেন বহু মানুষ।
ব্রড পিকের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছরগুলোর একটি ছিল ২০১৩ সাল। ওই বছর এই পর্বতে অন্তত ছয়জন প্রাণ হারান।
সূত্র : বিবিসি
সময়ের আলো/আআ