পরিবেশ সংরক্ষণে পুণ্য মেলে

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

মানুষ আজ প্রযুক্তি ও সভ্যতার উৎকর্ষে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে প্রকৃতি আজ বিপন্ন। বন উজাড়, নদী

2026-08-04T11:07:21+00:00
2026-08-04T11:07:21+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
পরিবেশ সংরক্ষণে পুণ্য মেলে
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষ আজ প্রযুক্তি ও সভ্যতার উৎকর্ষে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে প্রকৃতি আজ বিপন্ন। বন উজাড়, নদী দখল ও দূষণ, বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিকের আগ্রাসন এবং জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস পৃথিবীকে এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইসলাম এ সংকটকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। কুরআন ও সুন্নাহ মানুষকে পৃথিবীর মালিক নয়, বরং আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ একজন মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। পৃথিবীর মালিক আল্লাহ, মানুষ কেবল আমানতদার।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ৩০)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। একজন আমানতদার কখনো আমানতের ক্ষতি করতে পারে না। তাই প্রকৃতি ধ্বংস করা, বন উজাড় করা কিংবা পরিবেশ নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্বহীনতার পরিচয়।

পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে সংশোধনের পর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত : ৫৬)। তিনি আরও বলেন, ‘স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে’ (সুরা আর-রোম, আয়াত : ৪১)।

বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ, বন ধ্বংস এবং বায়ুদূষণ এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন। মানুষের সীমাহীন ভোগবাদ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য, যাতে তোমরা ভারসাম্য নষ্ট না করো’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত : ৭-৯)। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি নির্দিষ্ট ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী দখল কিংবা নির্বিচারে প্রাণী হত্যা সেই ভারসাম্য বিনষ্ট করে।

অপচয় পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা খাও, পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত : ৩১)। অতিরিক্ত ভোগ, খাদ্যের অপচয়, জ্বালানির অপব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় ভোক্তাবাদ পরিবেশ দূষণের বড় কারণ। ইসলাম সংযম ও মিতব্যয়িতার শিক্ষা দেয়। বৃক্ষরোপণ একটি চলমান সদকা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩২০)। একটি গাছ শুধু ছায়াই দেয় না; অক্সিজেন, ফল, কাঠ, বৃষ্টি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বৃক্ষরোপণ ইসলামে ইবাদতের মর্যাদা লাভ করেছে।

কেয়ামত উপস্থিত হলেও গাছ লাগানোর উৎসাহ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারা থাকে এবং তা রোপণ করার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৯০২)। এ হাদিস মানবসভ্যতাকে আশাবাদ, উৎপাদনশীলতা এবং পরিবেশ রক্ষার এক অনন্য শিক্ষা দেয়।

পানির অপচয় নিষিদ্ধ, এমনকি নদীর তীরেও। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে ওজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে বলেন, ‘এই অপচয় কেন?’ তিনি বললেন, ‘ওজুতেও কি অপচয় হয়?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রবহমান নদীর তীরে হলেও’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৫)। পানি সংরক্ষণ আজ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে।

রাস্তা ও জনপথ পরিষ্কার রাখা ঈমানের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও ঈমানের একটি শাখা’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯)।

রাস্তা, নদী, পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থল পরিষ্কার রাখা কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়; এটি ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানের পরিচয়ও বটে। পরিবেশ সংরক্ষণ কোনো আধুনিক স্লোগান নয়, এটি ইসলামের মৌলিক নৈতিক শিক্ষা।

কুরআন মানুষকে পৃথিবীর খলিফা হিসেবে দায়িত্বশীল হতে আহ্বান জানিয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃক্ষরোপণ, পানি সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও অপচয় বর্জনের মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। তাই আসুন, নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবেশ রক্ষাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করি। তা হলেই আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, সবুজ ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।

প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   পরিবেশ  সংরক্ষণ  পুণ্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: