জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাই যোদ্ধাদের মারধর ও অপমানের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই শহিদদের স্মরণে আলোচনা সভা এবং জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। পরে রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান জানিয়ে নীরবে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
আখতার হোসেন বলেন, অনুষ্ঠান চলাকালেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকারকে হলরুম থেকে বের হয়ে যেতে হয়েছে। মাহিন সরকারের সঙ্গে রিফাত রশিদ, আব্দুল কাদের ও আব্দুল হান্নান মাসুদসহ যারা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা এনসিপি ও অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন এবং তাদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠানে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে আখতার বলেন, আমি জুলাই যোদ্ধাদের একজন হিসেবে এবং আমার দলের প্রতিনিধি হিসেবে এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের সফলতা কামনা করি। কিন্তু আমার সহযোদ্ধাদের ওপর হামলা ও অপমানের পর আমার পক্ষে এখানে অবস্থান করা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে কোনো দলীয় কর্মসূচিতে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আজ একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছি, কোনো দলীয় অনুষ্ঠানে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব অংশীজনকে ধারণ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি হয়নি।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রের সমালোচনা করে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, সেখানে আন্দোলনের মূল প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, ঐতিহাসিক নয় দফা এবং ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঘোষিত এক দফা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আখতার হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না। বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থী দল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাদরাসার শিক্ষার্থী, প্রবাসী, শ্রমজীবী মানুষসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণেই এই অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় আয়োজনে সেই ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন ছিল।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন এক সময় একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও দলীয়ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হচ্ছে। ইতিহাস থেকে কোনো জুলাই যোদ্ধাকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা যাবে না।
তিনি বলেন, এটিকে আমি অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে মনে করি না। এটি সচেতনভাবে ইতিহাস বিকৃত ও দলীয়করণের প্রচেষ্টা। তবে অনুষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছেন উল্লেখ করে আখতার হোসেন বলেন, সেই বক্তব্যকে আমি স্বাগত জানাই।
বক্তব্যের শেষাংশে রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থে রাষ্ট্রপতি যেভাবে অবস্থান নিয়েছেন, তার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। সেই সম্মান অক্ষুণ্ন রেখেই আমি নীরবে এই অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করছি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ