বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। জুলাই আন্দোলনে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তিনিও ছিলেন জেলে। জেলে থাকাবস্থাতেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার খবর পান। সে সময়ের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন সময়ের আলোকে। আলাপে উঠে এসেছে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি
সময়ের আলো : সেদিনের জেলের ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে একটু বলুন
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু : সেই সময়ে আমরা যারা ঢাকা জেলখানায় ছিলাম, আমরা ৪ আগস্টেই আঁচ করতে পেরেছিলাম- বড় কিছু হতে যাচ্ছে। কিন্তু কী হতে যাচ্ছে তা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছিল না। ৫ আগস্ট ভোর থেকেই সবকিছু আটকানো ছিল। নিরাপত্তাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর সংবাদ পাই সেনাপ্রধান টিভিতে ভাষণ দেবেন। এরপর খবর আসতে থাকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছেন। সেনাপ্রধানের ভাষণের পর পুরো জেলখানা আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে। সবাই বেরিয়ে পড়ে। শুরু হয় মিছিল আর স্লোগান।
হাসিনার ভারতে পলায়ন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের খবরে জেলের পরিস্থিতি কেমন ছিল?
আমরা দুপুর ১২টার দিকে খবর পাই সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এরপর শুনতে পাই ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। সেনাপ্রধানের ভাষণের সঙ্গে সঙ্গেই পুরো জেলখানার সবাই আনন্দ-উল্লাস করতে থাকে। সবাই গারদ থেকে বের হয়ে যায়। অনেকেই জেলখানার গেট ভেঙে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে এ সময় জেলার সিনিয়র নেতাদের সহায়তা চান, যেন জেলখানার সবাই শান্ত থাকে, অপ্রীতিকর কিছু না হয়। সবাইকে বলি এক দিন পরেই সবাই বের হয়ে যাবা, গেট ভেঙে বের হয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে। এটা করা ঠিক হবে না। পরে আমাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তখন কী মনে হচ্ছিল?
১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভারতে পলায়ন ও আওয়ামী লীগের পতনের এই অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করার মতো না। এটা ছোটবেলায় ঈদের আনন্দের চাইতেও অনেক বেশি। দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়েছে। জনগণ মুক্ত হয়েছে। এখন জনগণ ভোট দিতে পারবে। আমরা মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারব। দেশ আবার গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসবে।
এর আগে তো আপনিসহ বিএনপি নেতাদের ডিবিতে রাখা হয়েছিল...
আমাদের ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তখন ডিবিতে হারুনের ভাতের হোটেলে ছিলাম। এর মধ্যেই হারুনকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা থাকাবস্থায় জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সারজিস-হাসনাতদের ডিবিতে নেওয়া হয়। এরপর তারা মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়- এটা সবাই জানে। ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ওরা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। আমরা গারদে ছিলাম। সে সময় সারজিস ও হাসনাতকে বলেছিলাম, তোমাদের মতো আন্দোলন করতে গিয়েই আজ আমরা কারাগারে। তোমরা কোনোভাবেই আন্দোলন বন্ধ করো না। ওরা কথা শুনে বেরিয়ে যায়। এরপরে আমরা ডিবিতে রিমান্ডে ছিলাম। ১৪ দিন রিমান্ড শেষে কোর্টে উঠিয়ে ৪ আগস্ট আমাদের ঢাকা জেলে নেওয়া হয়।
গ্রেফতার হওয়ার আগে ১৮ জুলাই দুপুরে কাকরাইল মসজিদে দুপুরের নামাজ পড়ি। সেখান থেকে বের হওয়ার পর আমার ও উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে মিছিল বের হয়। ১৯ জুলাই সকালে রামপুরায় নেতাকর্মীদের নিয়ে মিছিল করি। ২০ জুলাই রাতে ডিপ্লোমেটিক জোনে বাগেরহাট বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ সালামের বাসা থেকে তাকেসহ আমাকে গ্রেফতার করা হয়। পাশের রোড থেকে আমিনুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।
জেলে আপনার সঙ্গে বিএনপির কারা ছিলেন?
বিএনপির অধিকাংশ সিনিয়র নেতাকেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা জেলে ঢুকিয়েছিল। তারা সবাই আমার সঙ্গে এ সময় জেলে ছিলেন। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম, সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলাম নিরব, দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, আন্দালিভ রহমান পার্থ, নুরুল হক নুর ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ভাইসহ অনেকেই ছিলেন।
এই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা কী ছিল?
মরহুম চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পূর্ববর্তী ১৭ বছর আন্দোলন করেছে দলের নেতাকর্মীরা। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর নেতৃত্ব দেন দেশনায়ক তারেক রহমান। জুলাই অভ্যুত্থান কারও একার আন্দোলন না। জুলাই আন্দোলনে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা অংশ নিয়েছেন, আন্দোলন করছেন, শহিদ হয়েছেন। কাজেই আন্দোলনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে কোনো লাভ হবে না।
জুলাই আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বর্তমান সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের শহিদদের আত্মত্যাগ কখনোই বৃথা যাবে না। ‘জুলাই সনদে’ অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জুলাইয়ের শহিদরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, সেই গণতন্ত্র যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। এ লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনে শহিদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। সরকার শহিদ ও আহত পরিবারের পাশে রয়েছে এবং তাদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে