যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়ে শুক্রবার কোনো সমঝোতা হওয়ার ‘ফিফটি-ফিফটি’ সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ উপসাগরীয় কূটনীতিক। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি ‘আসন্ন’। এই দ্বিমুখী বার্তার মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সিএনএন এক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের প্রতিনিধি দলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কোনো প্রতিনিধি নেই। অথচ এই বাহিনীর সম্মতি ছাড়া কোনো অস্থায়ী চুক্তির বিস্তারিত বিষয় চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার কর্মকর্তারা ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘খুবই ভালো আলোচনা’ করছেন। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যদি ইরান ‘আবার পিছু হটে’ তা হলে দেশটিকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করা হবে। পৃথক এক বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তি হতে পারে।
তবে ইরান এখন পর্যন্ত সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো শান্তি আলোচনার কথা অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, তারা কেবল ওমানের সঙ্গে কথা বলছে এবং সে আলোচনা কেবল হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের বিষয়টি সুসংহত করতে। কূটনীতিকদের একাংশের মতে, এই প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াই আসল বোঝাপড়ার মূল চাবিকাঠি। এই চ্যানেল খুলে দিলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বৈঠকের নতুন দ্বার খুলতে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে এই জলপথে তিনটি ভিন্ন রুট ব্যবহারের কথা শোনা যাচ্ছে। প্রতিটির ঝুঁকি ভিন্ন। প্রথমটা ইরান রুট। ইরানের নিজস্ব সামুদ্রিক সীমানায় চলা এই পথটি তেহরান জুনের ১৯ তারিখ থেকে একমাত্র নিরাপদ রুট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্য পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে ইরান বারবার প্রতিহত করেছে। এই পথ নিয়ে জটিলতার কারণে মার্কিন হামলায় জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতিও ভেঙে গেছে।
আরেকটি রুট হলো ওমান-আইএমও রুট। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (আইএমও) ও ওমানের প্রস্তাবিত এই পথটি প্রণালির দক্ষিণে ওমানের উপকূল ঘেঁষে অবস্থিত। ইরানের অভিযোগ, ওমান মার্কিন চাপে এরপর পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৭
শুক্রবার সমঝোতার চান্স ফিফটি-ফিফটি
এই রুট খুলেছে। প্রণালির কাছে ওমানের সামুদ্রিক সীমানায় ইরানি বাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে গুলি করে ফিরিয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। তৃতীয় রুটটি হলো যুদ্ধপূর্ব রুট। প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই পথটি এখন ইরান ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঝুঁকি সত্ত্বেও কিছু জাহাজ এখনও এই রুট ব্যবহার করছে। বিশেষ করে ইরানের পাতানো মাইনের আশঙ্কা এ পথটিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্নে চলাচল করত।
এদিকে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি জাহাজ ডুবে গেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, একটি ড্রোন হামলায় ওই জাহাজে আগুন ধরে যায় এবং পরে তলিয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটেছে ইয়েমেনের আল মোখা শহরের উপকূল থেকে নয় নটিক্যাল মাইল দূরে। জাহাজের নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং দায়ী কারও পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। তবে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা বারবার এই প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত করার হুমকি দিয়ে আসছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইয়েমেনের উপকূলে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ কোনো ‘প্রজেক্টাইলের’ আঘাতে ডুবে গেছে। তবে চৌদ্দ নাবিককে নিরাপদে আল মোখা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রয়টার্সের বরাত দিয়ে ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, হুথিরা বিস্ফোরক বোঝাই একটি নৌকা ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবশেষ বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি ছিল গত জুন মাসে। যখন দুই পক্ষ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধানের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত বাধলে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ আরোপ করে এবং আঞ্চলিক সংঘাত নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, হরমুজ প্রণালি ‘শিগগিরই’ খুলতে হবে, নয়তো ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ‘খুবই ভালো আলোচনার’ কথাও বলছেন।
এই দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, পারস্য উপসাগরীয় এই জলপথ নিয়ন্ত্রণই এখন দুই পরাশক্তির কূটনীতি ও সামরিক শক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দু। আর এই কেন্দ্রবিন্দু ঘিরেই নির্ধারিত হবে, আঞ্চলিক শান্তি ফিরবে, নাকি আরও এক দফা সংঘাতের আগুন জ্বলবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে