আল-সাইয়েদের জয় ঠেকাতে পারল না ইসরায়েল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে (সিনেটপ্রার্থী বাছাই নির্বাচন) জিতে নতুন ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন প্রগতিশীল জনস্বাস্থ্যকর্মী আবদুল আল-সাইয়েদ। ৬ কোটি ডলার

2026-08-07T03:02:34+00:00
2026-08-07T03:02:34+00:00
 
  শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আল-সাইয়েদের জয় ঠেকাতে পারল না ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০২ এএম 
আবদুল আল-সাইয়েদ। ছবি : সংগৃহীত
মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে (সিনেটপ্রার্থী বাছাই নির্বাচন) জিতে নতুন ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন প্রগতিশীল জনস্বাস্থ্যকর্মী আবদুল আল-সাইয়েদ। ৬ কোটি ডলার খরচ করেও তার জয় ঠেকাতে পারেনি ইসরায়েলি গোষ্ঠীগুলো। আগামী নভেম্বরে চূড়ান্ত নির্বাচনে জিততে পারলে তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। এই জয় কেবল একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্যও বড় পরীক্ষা। যদিও আবদুল আল-সাইয়েদের রাজনৈতিক পথ মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে তিনি বড় ব্যবধানে হেরে যান। অনেকের ধারণা ছিল, তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সেখানেই শেষ।

কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। নির্বাচনের পর পডকাস্ট শুরু করেন, বই লেখেন, ইউটিউব ও টেলিভিশনে নিয়মিত মতামত দিতে থাকেন। ধীরে ধীরে নিজের বিশাল ভক্তগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। নির্বাচনি মঞ্চের বাইরে থেকেও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, যদিও জানতেন না সেই সুযোগ কবে আসবে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন করে সিনেট নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেন। তখন তার পক্ষে ছিলেন মাত্র চারজন কর্মী। প্রচারণার শুরুর দিকে কখনো কখনো পাঁচজন মানুষকে নিয়েও সভা করতে হয়েছে।

কিন্তু সেই ছোট্ট শুরুই একসময় বড় হয়ে ওঠে। গত ১৫ মাসে তিনি ১১০টি শহর ঘুরেছেন, পাঁচ শতাধিক জনসভা করেছেন এবং প্রায় ১২ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তার ভাষায়, প্রতিটি ছোট বৈঠকই ছিল মানুষের কষ্ট, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার একটি সুযোগ।
 
এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত হতে পারেননি কে জিতবেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ ভোটের মধ্যে মাত্র ১৪ হাজার ৮৯৩ ভোটের ব্যবধানে জয় পান আল-সাইয়েদ। তবে এটি কোনো সংকীর্ণ জয় নয়। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল ব্যতিক্রমী। আগের বহু সিনেট, গভর্নর এবং প্রেসিডেন্ট প্রাইমারির তুলনায় এবার বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। ফলে এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

আল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্স। তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার, বিদায়ি সিনেটর গ্যারি পিটার্স ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই। অন্যদিকে আল-সাইয়েদের পাশে ছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগতিশীল নেতারা।

নির্বাচনি প্রচারণায় তার প্রতিপক্ষের পক্ষে ইসরায়েলপন্থি গোষ্ঠীগুলো প্রায় ৬ কোটি ডলারের বেশি নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থি লবিং গ্রুপ ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ বা
এআইপিএসি আল-সাইয়েদের বিপক্ষে ছিল। এত বড় আর্থিক শক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে জয় পাওয়াকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় চমক বলে মনে করছেন।

আল-সাইয়েদের প্রচারণার আরেকটি বিশেষ দিক ছিল তার যোগাযোগ কৌশল। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি তিনি পডকাস্ট, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাদেরও গুরুত্ব দিয়েছেন। নির্বাচনের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় নির্মাতাদের সঙ্গে প্রচারণায় অংশ নেন এবং তরুণ ভোটারদের কাছে নিজের বার্তা পৌঁছে দেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে রাজনীতির পরিবর্তিত চেহারার একটি উদাহরণ হিসেবেও এই কৌশলকে দেখা হচ্ছে। প্রাইমারিতে জয় পেলেও আল-সাইয়েদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনও বাকি।

নভেম্বরে তাকে রিপাবলিকান নেতা ও সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের মুখোমুখি হতে হবে। এই নির্বাচন কেবল মিশিগানের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানে এর ওপর নির্ভর করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। বিবিসি বলছে, তাই সামনে আল-সাইয়েদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও আছে। প্রাইমারিতে তিনি মূলত উচ্চশিক্ষিত উদারপন্থি ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন। কিন্তু সাধারণ নির্বাচনে জিততে হলে তাকে নিম্নআয়ের ভোটার ও গ্রামীণ এলাকার ভোটারদেরও আস্থা অর্জন করতে হবে। 

প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থকরা মনে করছেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করবে তাদের রাজনৈতিক দর্শন জাতীয় পর্যায়েও সফল হতে পারে কি না। অন্যদিকে রিপাবলিকানরাও ইতিমধ্যে বড় আকারের প্রচারণার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ফলে আগামী কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত লড়াইগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। আবদুল আল-সাইয়েদের গল্প কেবল একজন রাজনীতিকের উত্থানের গল্প নয়। এটি ধৈর্য, অধ্যবসায় ও দীর্ঘদিন ধরে নিজের বিশ্বাস ধরে রাখার গল্পও।

কয়েক বছর আগেও যাকে রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে মনে করা হয়েছিল, তিনিই আজ ইতিহাস গড়ার সবচেয়ে  এরপর 
কাছাকাছি অবস্থানে। নভেম্বরের ফল যাই হোক, তার এই যাত্রা ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনীতিতে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তন শুরু হয় সবচেয়ে বড় পরাজয়ের পর থেকেই।

আবদুল আল-সাইয়েদ এমন একজন প্রার্থী, যিনি দলীয় প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের পছন্দ ছিলেন না। তবু তিনি জিতেছেন। আর সে কারণেই তার জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিশিগানের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবদুল আল-সাইয়েদ শুরু থেকেই নিজেকে একজন প্রগতিশীল রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ওষুধের দাম কমানো, ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ ও রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানোর মতো বিষয়গুলো ছিল তার নির্বাচনি প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতি। বিশ্লেষকদের মতে, বিতর্কসভা, জনসভা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবদুল আল-সাইয়েদ যদি নভেম্বরে জিতে যান, তা হলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশ আরও শক্তিশালী হবে। সে ক্ষেত্রে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলটি মধ্যপন্থি নয় বরং আরও বাম-ঘেঁষা কোনো প্রার্থীকে সামনে আনার সাহস দেখাতে পারে। অন্যদিকে তিনি যদি হেরে যান, তা হলে ডেমোক্র‍্যাটিক পার্টির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব বলার সুযোগ পাবে যে, অতিরিক্ত বামপন্থি অবস্থান জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারে না।

মিশিগানের নির্বাচন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। হেইলি স্টিভেন্স ছিলেন ইসরাইলের প্রকাশ্য সমর্থক। কিন্তু তিনি হেরে গেছেন। একই দিনে মিশিগানের আরও কয়েকটি নির্বাচনে এমন প্রার্থীরাও জয় পেয়েছেন, যারা গাজা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতির কড়া সমালোচক। অবশ্য এই চিত্র সব জায়গায় এক নয়। ওয়াশিংটন ও মিসৌরির মতো অঙ্গরাজ্যে আবার ইসরাইল সমর্থক ডেমোক্র‍্যাট প্রার্থীরাও জয় পেয়েছেন। অর্থাৎ ডেমোক্র‍্যাটিক পার্টির ভেতরে এই প্রশ্নে এখনও স্পষ্ট কোনো একক অবস্থান তৈরি হয়নি।

মিশিগানের পাশাপাশি কানসাস ও মিসৌরিতেও ভোট হয়েছে। মিসৌরিতে ভোটাররা এমন একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা রাজ্যের সংবিধান সংশোধন আরও কঠিন করে তুলত। কানসাসেও ভোটাররা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। দুই ক্ষেত্রেই রিপাবলিকানদের সমর্থিত উদ্যোগ পরাজিত হয়েছে। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের ভোটারদের একটি অংশ এখন রিপাবলিকান নীতির প্রতি আগের মতো উৎসাহী নন। বিবিসি বলছে, রিপাবলিকান দলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব এখনও স্পষ্ট।

মিশিগান, কানসাস ও ওয়াশিংটনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাইমারিতে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। তবে সব জায়গায় তার প্রভাব সমান ছিল না। মিশিগানের একটি নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকানদের মধ্যেও তার প্রভাব আগের মতো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। 

মিশিগানের এই নির্বাচন শুধু একটি প্রাইমারির ফল নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলই এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ডেমোক্র‍্যাটদের সামনে প্রশ্ন, তারা কি আগের মতো মধ্যপন্থি রাজনীতি করবে, নাকি আরও প্রগতিশীল অবস্থানে যাবে? অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জন্যও প্রশ্ন, ট্রাম্পনির্ভর রাজনীতি কতদিন কার্যকর থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলতে শুরু করবে আগামী নভেম্বরে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, আবদুল আল-সাইয়েদের জয় কেবল একটি নির্বাচনি ফল নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সম্ভাব্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাও।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   আল-সাইয়েদ  জয়  ইসরায়েল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: