মানবজীবনের পরিধি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, অথচ এর বিপরীতে আখিরাতের জীবন চিরন্তন। এই নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে একদিন সবাইকে চিরকালের ঠিকানায় পাড়ি জমাতে হবে। আর সেই অন্তহীন যাত্রায় মুক্তি এবং জান্নাত অর্জনের অন্যতম সহজ ও বরকতময় মাধ্যম হলো দান-সদকা। এটি কেবল সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনমান উন্নত করে না, বরং দানকারীর দুনিয়া ও পরকালের জীবনকেও শান্তিময় করে তোলে। ইসলামে দান-সদকার গুরুত্ব, এর গভীর প্রভাব এবং জান্নাত লাভে এর অনন্য ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দ্রুত দানের তাগিদ ও জীবনের অনিশ্চয়তা
মৃত্যু মানুষের জীবনে কখন এবং কীভাবে উপস্থিত হবে, তা কারও জানা নেই। তাই পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সুস্থ ও জীবিত থাকতেই দান করার জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা মুনাফিকুনের ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রব! আমাকে যদি আর অল্প কিছু সময় দেওয়া হতো, তবে আমি দান করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ মৃত্যুর মুহূর্তে এই অনুশোচনা কোনো উপকারে আসে না। তাই সামর্থ্যবান অবস্থাতেই দান-সদকার মাধ্যমে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা প্রতিটি মুমিনের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
সম্পদে বরকত ও প্রাচুর্য বৃদ্ধি
সাধারণ মানুষের মাঝে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, দান করলে নিজের জমানো অর্থ বা সম্পদ কমে যায়। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নামে কসম কেটে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, দান-সদকা কখনো মানুষের সম্পদ কমায় না; বরং এটি সম্পদে আল্লাহর বরকত ও প্রাচুর্য বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত ও আন্তরিকভাবে দান করার মাধ্যমে মানুষ যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, তেমনি তার রিজিক ও সম্পদে বরকত নেমে আসে।
গুনাহ মোচন ও জাহান্নাম থেকে সুরক্ষা
সদকার সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক সুফল হলো এটি বান্দার অতীতের যাবতীয় গুনাহ মাফ করাতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সুন্দর একটি উপমা দিয়ে বলেছেন, পানি যেমন লহমায় আগুন নিভিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি দান-সদকা মানুষের গুনাহ মুছে ফেলে। আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করলে তা কবুল হয় এবং বান্দাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচানোর ঢাল হিসেবে কাজ করে। হাশরের কঠিন দিনে এই দানই দানকারীর জন্য নিরাপত্তার চাদর হয়ে দাঁড়াবে।
শত্রু ও অভিশাপ থেকে মুক্তির ঐতিহাসিক রূপক
সদকার গভীর প্রভাব বোঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর একটি চমৎকার রূপক বর্ণনা করেছেন। তিনি বনি ইসরাইলকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আমাকে তোমাদের সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ যে ব্যক্তি সদকা করে, তার উদাহরণ ওই ব্যক্তির মতো—যাকে শত্রুরা বন্দি করেছে এবং তার হাত ঘাড়ে বেঁধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখন সে তার কাছে থাকা সামান্য ধনসম্পদ দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার প্রস্তাব দেয় এবং শত্রুরা সেই প্রস্তাব মেনে নিলে সে মৃত্যুদণ্ড থেকে চিরতরে মুক্তি পায়।’ (জামে তিরমিজি)
এই উপমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, মানুষ তার নিজ পাপের কারণে মূলত শয়তানের খপ্পরে বন্দি হয়ে পড়ে। আর সদকা হলো সেই মোক্ষম মুক্তিপণ, যা আল্লাহর অশেষ রহমতে মানুষকে জাহান্নামের অবধারিত শাস্তি থেকে রক্ষা করে জান্নাতের সুগম পথের দিকে এগিয়ে নেয়।
মৃত্যুর পরও সওয়াব অব্যাহত রাখার মাধ্যম
মানুষ যখন পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে বিদায় নেয়, তখন তার আমলনামার সমস্ত দরজাও চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সদকা হলো এমন এক অনন্য ও দূরদর্শী ইবাদত, যা মৃত্যুর পরও বান্দার সওয়াবের ধারা সচল রাখে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর কেবল তিনটি বিশেষ কাজের সুফল বা সওয়াব অব্যাহত থাকে :
সাদকায়ে জারিয়া : প্রবহমান দান, যেমন— মসজিদ নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদরাসা স্থাপন, নলকূপ বসানো বা জনকল্যাণমূলক যেকোনো স্থায়ী কাজ।
উপকারী জ্ঞান : মানবকল্যাণে ব্যবহৃত দ্বীনি ও দরকারি জ্ঞান বিতরণ।
নেক সন্তান : এমন সুসন্তান, যে মা-বাবার জন্য নিয়মিত দোয়া করে।
একজন মুমিন যখন দুনিয়াতে কোনো সদকায়ে জারিয়া করে যান, তখন তার কবরেও অবিরাম সেই দানের সওয়াব পৌঁছাতে থাকে, যা পরকালে জান্নাতে প্রবেশের পথকে সুনিশ্চিত ও অত্যন্ত সহজ করে তোলে।
সদকার বিস্তৃত পরিধি ও প্রকৃত হকদার
ইসলামে সদকা কেবল আর্থিক অনুদান বা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা-পয়সা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, একজন মুসলিম ভাইয়ের মুখে আন্তরিক হাসি ফোটানো, কাউকে একটি সঠিক ও উত্তম পরামর্শ দেওয়া, রাস্তা থেকে কোনো কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা কিংবা মানুষের উপকারে আসে এমন যেকোনো সৎকর্মই সদকার অন্তর্ভুক্ত।
তবে আর্থিক সদকা বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রকৃত ও উপযুক্ত হকদারদের সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এতিম, অসহায়, দরিদ্র, বিধবা এবং চরম অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই করে তাদের পাশে দাঁড়ালে দানের মূল উদ্দেশ্য সার্থক হয় এবং সমাজে শান্তি ও কল্যাণের প্রসার ঘটে।
সংক্ষেপে বলা যায়, দান-সদকা কেবল একটি সাধারণ আর্থিক অনুদান নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, গুনাহ মোচন, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাওয়া, সম্পদে বরকত লাভ এবং জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম অর্জনের এক মহৎ ইবাদত। দুনিয়ার মোহ একদিন ফুরিয়ে যাবে এবং সমস্ত সম্পদ পেছনে ফেলে চলে যেতে হবে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা একটি আন্তরিক সদকার প্রতিদান চিরকাল পরকালের পাথেয় হয়ে টিকে থাকবে।
সময়ের আলো/জেডি