আমরা এমন একসময়ে বসবাস করছি, যখন মানুষের কাছে অর্থের মূল্য বেড়েছে, কিন্তু আমানতের মূল্য কমে যাচ্ছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ধন-সম্পদ, পদ-পদবি বা খ্যাতিতে নয়; বরং তার ঈমান, তাকওয়া এবং আমানতদারিতায়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা যেন আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও; আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৫৮)। এটি কেবল একটি উপদেশ নয়, এটি মহান রবের নির্দেশ। যে ব্যক্তি আল্লাহর এই নির্দেশ পালন করে, সে শুধু মানুষের কাছে নয়, আল্লাহর কাছেও সম্মানিত হয়।
আমানত বলতে শুধু অর্থ বা সম্পদ বোঝায় না। আমাদের ঈমান, নামাজ, সময়, পরিবার, সন্তান, দায়িত্ব, কর্মস্থল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, মানুষের গোপন কথা, এমনকি আমাদের জ্ঞান ও সামর্থ্য- সবই আল্লাহর দেওয়া আমানত। প্রতিটি আমানত সম্পর্কে একদিন আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘যারা নিজেদের আমানত ও অঙ্গীকারের হেফাজত করে’ (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত : ৮)। একই গুণের কথা আল্লাহ সুরা আল-মাআরিজে পুনরায় উল্লেখ করেছেন। কুরআনে কোনো বিষয় বারবার উল্লেখ হওয়া তার গুরুত্বেরই প্রমাণ।
আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা দেখি, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আসমান, জমিন ও পর্বতমালার সামনে আমানতের দায়িত্ব পেশ করেছিলাম। তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং এতে ভীত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল’ (সুরা আল-আহজাব, আয়াত : ৭২)।
কী বিস্ময়কর এই আয়াত! বিশাল আসমান, সুদৃঢ় পর্বত ও বিস্তীর্ণ জমিন যে দায়িত্ব গ্রহণে ভয় পেয়েছে, সেই দায়িত্ব মানুষ গ্রহণ করেছে। তাই প্রতিটি মানুষের জীবন আসলে একটি আমানতের সফর, যার শেষ গন্তব্য আল্লাহর দরবার। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত। নবুওয়তের আগেও মানুষ তাঁকে এই উপাধিতে ডাকত। তিনি বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার পূর্ণ ঈমান নেই।’ (মুসনাদ আহমাদ)।
আজ আমাদের চারপাশে অশান্তির একটি বড় কারণ হলো আমানতের খিয়ানত। এর ফলে পরিবারে বিশ্বাস নষ্ট হচ্ছে, ব্যবসায় সততা কমছে, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা বাড়ছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার হচ্ছে। অথচ প্রত্যেক মানুষ যদি নিজের দায়িত্বকে আল্লাহর আমানত মনে করত, তা হলে অনেক সমস্যাই দূর হয়ে যেত।
মনে রাখতে হবে, মানুষকে ফাঁকি দেওয়া হয়তো কখনো সম্ভব, কিন্তু আল্লাহকে কখনো ফাঁকি দেওয়া যায় না। তিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সর্বদা পর্যবেক্ষক।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১)।
তাই আমাদের প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, আমি কি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি? আমার উপার্জন কি হালাল? আমার কাছে অর্পিত দায়িত্ব, সময় ও বিশ্বাসের যথাযথ হেফাজত করছি তো? আসুন, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানাই। আমানত রক্ষা করি, সত্যকে আঁকড়ে ধরি, মানুষের হক আদায় করি এবং প্রতিটি কাজে মনে রাখি- একদিন মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিটি আমানতের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী আমানতদার, সত্যবাদী ও তাকওয়াবান বানিয়ে দিন।
সময়ের আলো/এসএকে