জুলুমের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। সভ্যতার শুরু থেকেই অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষ বারবার দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসে যে জাতি জুলুমের কাছে মাথা নত করেছে, তারা স্বাধীনতা ও মর্যাদা হারিয়েছে। আর যারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থেকেছে, তাদের সংগ্রাম যুগের পর যুগ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে হাজারো ছাত্র-জনতা বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও অধিকার বঞ্চনার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল। অনেকেই জীবন দিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন, অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জন। এই আত্মত্যাগ দেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার এই চেতনা ইসলামের কাছেও অপরিচিত নয়। বরং পবিত্র কুরআন ও ইসলামের ইতিহাসে বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন এমন সমাজে, যেখানে শক্তিশালীরা দুর্বলদের অধিকার হরণ করত, মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করত। নবী-রাসুলদের দাওয়াতের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে জুলুমের অন্ধকার থেকে ন্যায় ও ইনসাফের আলোয় ফিরিয়ে আনা।
ইসলামের ইতিহাসে হজরত মুসা (আ.)- এর ঘটনা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। ফিরাউন নিজেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করত। সে মানুষকে দাসে পরিণত করেছিল, বিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করত এবং নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নিরীহ মানুষকে হত্যা করত। সেই জুলুমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.)-কে সত্যের বার্তা নিয়ে পাঠান। দীর্ঘ সংগ্রামের পর শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল ফিরাউন, আর বিজয় হয়েছিল সত্যের।
একইভাবে নবী মুহাম্মদ (সা.)- এর জীবনের মক্কার পর্বও ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে ধৈর্য, সাহস ও সত্যের এক অনন্য ইতিহাস। কুরাইশ নেতারা মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়েছে, অনেক সাহাবিকে শহিদ করেছে। কিন্তু সত্যের সেই আহ্বান থামানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত ইসলামের বিজয় হয়েছে, আর জুলুমের শক্তি ইতিহাসের পাতায় পরাজয়ের প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।
ইসলামের ইতিহাসের এসব ঘটনা আমাদের একটি চিরন্তন সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়— ক্ষমতা নয়, ন্যায়ই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। জুলুম যত দীর্ঘই হোক, তার পরিণতি শুভ হয় না। আর মানুষের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কখনো নিভে যায় না। তাই ইতিহাসের প্রতিটি জুলুমবিরোধী অধ্যায়ের মতোই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠ কখনো পুরোপুরি স্তব্ধ করা যায় না। সত্য, ন্যায় এবং মানুষের মর্যাদার দাবি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নেয়। ইসলামের ইতিহাসও সেই চিরন্তন শিক্ষাই যুগে যুগে মানবজাতিকে দিয়ে এসেছে।
সময়ের আলো/এসএকে