আল্লাহ তায়ালার কাছে একজন মুমিনের সবচেয়ে সম্মানজনক মর্যাদাগুলোর একটি শাহাদাত। আল্লাহর সন্তুষ্টি, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গকারী বান্দাদের জন্য তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে বিশেষ সম্মান ও পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। তাই ইসলামে শহিদ হওয়া কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়, বরং এটি ঈমানদার মানুষের জন্য সর্বোচ্চ সৌভাগ্যের একটি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের থেকে যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না। তারা তো জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৪)।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত।’ (সুরা ইমরান, আয়াত : ১৬৯)।
এসকল আয়াত থেকে বোঝা যায়, শহিদদের জন্য আল্লাহ এমন এক বিশেষ জীবন ও সম্মান নির্ধারণ করেছেন, যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির বাইরে।
শহিদদের মর্যাদা সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে প্রবেশের পর কোনো ব্যক্তি পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাইবে না। তবে শহিদ চাইবে পৃথিবীতে ফিরতে চাইবে। সে চাইবে, তাকে আবার পৃথিবীতে পাঠানো হোক, যাতে সে দশবার আল্লাহর পথে শহিদ হতে পারে। কারণ সে শাহাদাতের অসীম মর্যাদা ও প্রতিদান প্রত্যক্ষ করবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৯৫। মুসলিম, হাদিস : ১৮৭৭)।
অন্য আরেক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘শহিদের জন্য আল্লাহর কাছে ছয়টি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে—প্রথম রক্তবিন্দু ঝরার সঙ্গে সঙ্গেই তার গুনাহ ক্ষমা করা হয়, তাকে জান্নাতে তার স্থান দেখানো হয়, কবরের আজাব থেকে নিরাপদ রাখা হয়, কিয়ামতের ভয় থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, সম্মানের মুকুট পরানো হয় এবং সে তার আত্মীয়দের মধ্য থেকে সত্তর জনের জন্য সুপারিশ করতে পারবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৬৩। ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৭৯৯)।
শাহাদাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে শাহাদাত কামনা করে, আল্লাহ তাকে শহিদদের মর্যাদা দান করেন, যদিও সে নিজের বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯০৯)। আবার তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের জীবন, সম্পদ, পরিবার বা দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহিদ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৪২১। আবু দাউদ, হাদিস : ৪৭৭২)।
ইসলাম জুলুম, নির্যাতন ও অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করো না, যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদের এ জালিম জনপদ থেকে বের করে নিন।’ (সুরা নিসা, আয়াত :৭৫)।
আর নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো জালিম শাসকের সামনে ন্যায়ের কথা বলা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৭৪। আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৪৪)।
তাই জুলুম, আগ্রাসন ও অবিচারের বিরুদ্ধে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ন্যায়সংগ্রাম করতে গিয়ে কেউ নিহত হলে এবং তার মধ্যে শরিয়তসম্মত শাহাদাতের শর্ত বিদ্যমান থাকলে, সে শহিদের মর্যাদার অধিকারী হবেন।
তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামে শহিদ হওয়ার মূল শর্ত হলো বিশুদ্ধ ঈমান, ইখলাসপূর্ণ নিয়ত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। কেবল কোনো যুদ্ধে বা আন্দোলনে নিহত হলেই কাউকে নিশ্চিতভাবে শহিদ বলা যায় না। কার অন্তরের নিয়ত কী ছিল, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে শহিদের ঘোষণা না দিয়ে, তার জন্য আল্লাহর কাছে শাহাদাতের মর্যাদা ও উত্তম প্রতিদানের দোয়া করাই ইসলামের শিক্ষা।
শহিদদের জীবন আমাদের শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা, জুলুমের সামনে মাথা নত না করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানানোই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সত্যের পথে অটল থাকার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
সময়ের আলো/এসএকে