কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন শরণার্থীর প্রায় ১ জন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জ্বর, ডায়রিয়া ও কাশির মতো তীব্র রোগের চিকিৎসায় এই ঘাটতি সবচেয়ে প্রকট। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং ট্রমা-পরবর্তী সেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংকট।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার কারণে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে তাদের বেশির ভাগের বাস কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে এবং ৩৫ হাজারের বেশি ভাসানচরে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে এলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।
এ তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক জার্নাল PLOS Global Public Health এ প্রকাশিত 'Unmet need for health care services among Rohingya Refugees living in Cox’s Bazar and Bhasan Char in Bangladesh' শীর্ষক গবেষণায়।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. নুরুজ্জামান খাঁন, একই বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বাদশা আলম ও মো. সোহেল রানা এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের গবেষক কারেন ব্লক। নুরুজ্জামান খাঁন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।
গবেষণায় ২০২৩ সালের Bhasan Char Needs Assessment এবং ২০২৪ সালের Joint Multi-Sectoral Needs Assessment এর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে মোট ১১ হাজার ৪২১ জন রোহিঙ্গার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার ৩৫৭ জন কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্প এবং ১ হাজার ৬৪ জন ভাসানচরের বাসিন্দা। তথ্য সংগ্রহে স্তরভিত্তিক নমুনা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় এবং প্রশিক্ষিত তথ্যসংগ্রাহকেরা সরাসরি সাক্ষাৎকার নেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে। নারী ছিলেন ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রায় ২০ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধীর শিকার হয়ে বসবাস করছিলেন। প্রায় অর্ধেকের বাসা থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে ১০ মিনিটের কম সময় লাগে এবং ৯৫ শতাংশই হেঁটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান।
গবেষণায় দেখা যায়, মোট অংশগ্রহণকারীদের ১০ দশমিক ৩ শতাংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাননি। কক্সবাজারে এ হার ১০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভাসানচরে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দুই অঞ্চলের সামগ্রিক চিত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তবে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট। উখিয়ার তুলনায় টেকনাফের ক্যাম্পে বসবাসকারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চনার হার ছিল টেকনাফের নয়া পাড়া শরণার্থী শিবিরে, ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ছিল উখিয়ার ক্যাম্প ১৮ তে, ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ৮০ শতাংশ মানুষ তীব্র রোগের চিকিৎসা বা ওষুধ পাননি। ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেমন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা পাননি। এছাড়া ৪ দশমিক ৮ শতাংশ ট্রমা কেয়ার এবং ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিকল্পিত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সেবা পাননি। ভাসানচরে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও ট্রমা কেয়ারে অপূর্ণ চাহিদা কক্সবাজারের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি ছিল।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের তুলনায় ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সিদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার ঝুঁকি ৫৪ শতাংশ বেশি। মাঝারি ও গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে গুরুতর প্রতিবন্ধী থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, ভাসানচরে স্থানান্তরের কারণে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা না গেলেও কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও মোবাইল ক্লিনিকের মতো উদ্যোগ বাড়ানোরও সুপারিশ করেছেন তারা।
গবেষকেরা আরও উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংগৃহীত বড় পরিসরের তথ্য ব্যবহার করায় গবেষণাটির ফলাফল নির্ভরযোগ্য। তবে এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক (cross-sectional) গবেষণা হওয়ায় কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। পাশাপাশি তথ্য অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব বর্ণনার ওপর নির্ভর করায় কিছু ক্ষেত্রে স্মৃতিনির্ভর বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রভাব থাকতে পারে।
গবেষণার শেষ অংশে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করতে সরকার ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী বৃদ্ধি এবং উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ক্যাম্পগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সময়ের আলো/জোই