বাংলাদেশের বরেণ্য হাদিসবেত্তা মাওলানা আব্দুল মতিনের দীর্ঘ ২৬ বছরের সাধনা ও গবেষণার ফসল ১৭ খণ্ডের বিশাল আরবি ব্যাখ্যা গ্রন্থ ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’। জামে তিরমিজির অন্যতম পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত এই আরবি ব্যাখ্যা গ্রন্থটি কেবল ইসলামি গবেষণায় এক মূল্যবান সংযোজনই নয়, বরং বাংলাদেশের হাদিসচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবের মাইলফলক।
গ্রন্থটির প্রকাশনা উপলক্ষে ৪ আগস্ট রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক বর্ণাঢ্য ও বিশেষ ইলমি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান আলেম, গবেষক ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মুখরিত এই আয়োজনে বক্তারা গ্রন্থটির আন্তর্জাতিক মান ও গবেষণামূলক গভীরতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। হাদিসবিশারদদের মতে, জামে তিরমিজির অন্যতম পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যা গ্রন্থ হিসেবে এটি ইসলামি গবেষণায় মূল্যবান সংযোজন।
সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নুমানী। তিনি বলেন, জামে তিরমিজির ব্যাখ্যায় অতীতেও বহু আলেম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় মাওলানা আব্দুল মতিনের এ গ্রন্থ উম্মতের জন্য মূল্যবান সংযোজন। প্রাচীন ও সমকালীন গবেষণার সমন্বয়ে রচিত এ গ্রন্থ আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হওয়ার জন্য তিনি দোয়া করেন।
সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার বলেন, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তিনি লেখকের গবেষণাকর্মের সঙ্গে পরিচিত। তার মতে, এ গ্রন্থ হাদিস পাঠদান ও দরসের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক শায়খ তাহমিদুল মাওলা বলেন, গ্রন্থটির প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পরই দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রকাশিত এ গ্রন্থের মাধ্যমে জামে তিরমিজির পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যা রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের একজন আলেমের হাতে এ কাজ সম্পন্ন হওয়া দেশের জন্যও গৌরবের বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
লেখক মাওলানা আব্দুল মতিন বলেন, এটি মূলত দোয়া ও শুকরিয়ার আয়োজন। ২০০১ সালে জামে তিরমিজির পাঠদান শুরু করার মধ্য দিয়ে এ গ্রন্থের গবেষণাকাজের সূচনা হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মূল রচনার কাজ সম্পন্ন হলেও এর পেছনে রয়েছে প্রায় ২৬ বছরের ধারাবাহিক অধ্যয়ন, গবেষণা ও পরিশ্রম। তিনি এ গ্রন্থের কল্যাণ ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, হাদিসের আদব, মতপার্থক্যের শিষ্টাচার এবং ইলমি ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তার মতে, গ্রন্থটি হাদিসচর্চার বিভিন্ন শূন্যতা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়ার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার বলেন, প্রায় ২৬ বছরের গবেষণার ফসল এ গ্রন্থ। একটি শব্দের ব্যাখ্যার জন্যও লেখক অসংখ্য মূলগ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন। ভবিষ্যতে জামে তিরমিজি নিয়ে গবেষণায় এটি একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার আলেম শায়খ ইসহাক বানা, মক্কার গবেষক ড. শায়খ আবদুল আজিজ আলহাজ, দারুল উলুম দেওবন্দের শূরা সদস্য শায়খ হাসান মাহমুদ রাজস্থানী, সিলেটের প্রবীণ মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল হক সুরাইঘাটী, মালিবাগ জামিয়ার শায়খুল হাদিস মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ, ফরিদাবাদ মাদরাসার প্রধান মুফতি আবু সাঈদ এবং বিশিষ্ট আলেম মাওলানা দিলাওয়ার হোসাইনসহ দেশ-বিদেশের আলেমরা বক্তব্য রাখেন।
তারা গ্রন্থটির গবেষণামূলক মান, পূর্ণাঙ্গতা ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, দীর্ঘ হাদিসচর্চার ইতিহাসে জামে তিরমিজির একটি পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যা গ্রন্থ প্রকাশ ইসলামি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্যও গৌরবের বিষয়।
অনুষ্ঠানে গবেষণামুখী শিক্ষা উৎসাহিত করতে নির্বাচিত ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সেট বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়।