শুক্রবার সপ্তাহের শুভ্রতম দিন। বৃহস্পতির সন্ধ্যাবেলায়ই যেন ফোটে জুমার ফুল, যা মাসে চারবার সুবাস ছড়িয়ে মোহিত করে পৃথিবীর অলিগলি। আরশ থেকে অবারিত রহমতের বারিধারায় এদিন মুমিনের মনে লাগে প্রশান্তির ছোঁয়া। সুবহে কাজিব পেরিয়ে জুমার ফজর হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ, কোমল ও শান্ত হৃদয়ের নুরের উৎস। আলোঝরা প্রভাত থেকে ঈমানদারের অন্তর আলোকিত হতে থাকে আর দ্বিপ্রহরে বাতাসে ভাসে জুমার আজান, যা মুমিনের হৃদয় আনন্দে নেচে তোলে। পার্থিব ব্যস্ততা একপাশে রেখে আত্মিক ও শারীরিক পবিত্রতা নিয়ে আল্লাহর ঘরের পানে শুরু হয় শুভর মিছিল; হাতে জায়নামাজ আর ঠোঁটে শান্তির রেখা নিয়ে মুমিনরা ছোটেন জান্নাতি কাফেলার পানে।
পাক-পবিত্র হয়ে, উত্তম পোশাক পরে এবং সুগন্ধি মেখে এই কাফেলায় শামিল হওয়ার গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। জুমার দিনের আমল সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুন্দরভাবে গোসল করে সকাল সকাল পায়ে হেঁটে মসজিদে আসে এবং ইমামের কাছাকাছি বসে অনর্থক কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার প্রতি কদমে রয়েছে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের নফল নামাজের সওয়াব (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১০৮৭)। অন্য হাদিসে এসেছে, ভালোভাবে গোসল করে, উত্তম আতর ও সুন্দর পোশাক পরে মসজিদে গিয়ে মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনলে এক জুমা থেকে আরেক জুমা এবং অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহিহ ইবনে খুজাইমা : ১৮০৩)
নেক আমলের প্রতি তীব্র আগ্রহই মানুষকে সবার আগে ভালো কাজ শুরু করতে সাহায্য করে। প্রকৃত মুমিন আজান শুনেই কালবিলম্ব না করে মসজিদে হাজির হন। আর আগেভাগে মসজিদে আসা বান্দার জন্য রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চমৎকার এক ঘোষণা। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালোভাবে গোসল করে নামাজের জন্য আগমন করে, সে যেন একটি উট কুরবানি করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করে, সে যেন একটি গাভি কুরবানি করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় পর্যায়ে আগমন করে, যে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানি করল। চতুর্থ পর্যায়ে যে আগমন করে সে যেন একটি মুরগি সদকা করল। পঞ্চম পর্যায়ে যে আগমন করে সে যেন একটি ডিম সদকা করল। পরে ইমাম যখন খুতবা প্রদানের জন্য বের হয়, তখন ফেরেশতাগণ জিকির শোনার জন্য হাজির হয়ে থাকেন। (সহিহ বুখারি : ৮৮১)
জুমার দিনের আরেকটি অন্যতম আমল হলো অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা। সুখ ও শান্তির পায়রা যেন সবসময় আমাদের জীবনের উঠোনে থাকে, সেই প্রার্থনায় দরুদ পাঠের বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা জুমার দিন আমার ওপর অধিক দরুদ পাঠ করো। যে আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন (শুয়াবুল ঈমান: ২৭৬৯)। অন্য হাদিসে একে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করে বেশি বেশি দরুদ পড়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (সুনানে নাসায়ি : ১৩৭৪)
পাশাপাশি জুমার দিনে রয়েছে দোয়া কবুলের বিশেষ কিছু মুহূর্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে ভালো কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা অবশ্যই দান করেন (সহিহ মুসলিম : ৮৫২)। এই বিশেষ সময়টি নিয়ে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে- একটি হলো আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (সুনানে তিরমিজি : ৪৮৯) এবং অন্যটি ইমাম সাহেবের খুতবার জন্য বসা থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত (সহিহ মুসলিম : ৮৫৩)। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জুমার দিনের এসব নেক আমল সহজ করে দিন এবং জুমাফুলের সুবাস আমাদের জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে দেওয়ার তাওফিক দান করুন।
লেখক শিক্ষক, জামিয়া রিয়াজুল উলূম, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
সময়ের আলো/জেডআই