শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন, প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

শাব্বির আহমাদ খান

ইসলাম

নিরাপদে একজন শিশুর বেড়ে ওঠা কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র। সবারই দায়িত্ব রয়েছে।

2026-09-22T17:36:22+00:00
2026-09-22T17:36:22+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন, প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা
শাব্বির আহমাদ খান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩৬ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
নিরাপদে একজন শিশুর বেড়ে ওঠা কেবল পরিবারের দায়িত্ব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র। সবারই দায়িত্ব রয়েছে। একটি শিশু দিনের বড় একটি সময় কাটায় স্কুল, মাদ্রাসা বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সেখানে সে পড়াশোনার পাশাপাশি শেখে আচরণ, মূল্যবোধ ও জীবনচলার পাথেয়। মা-বাবা বিশ্বাস করে নিজ সন্তানকে শিক্ষকের হতে অর্পণ করেন। প্রতিটি সন্তান শিক্ষকের কাছে আমানত।

এই বিশ্বাসের জায়গায় কোনো হেরেফের হলে তার প্রভাব শুধু শারীরিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে শিশুর মনে ভয়, অনাস্থা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা একটি শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ও আত্মমর্যাদায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।

ইসলাম শিশুর প্রতি দয়া, নিরাপত্তা ও সম্মানজনক আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাই শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা শুধু অপরাধের নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অপরাধের সুযোগ তৈরি হয় এমন পরিবেশ বন্ধ করার দিকনির্দেশনাও এতে রয়েছে।

ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আলে ইমরান: ৫৭)

শিশুর ওপর যেকোনো ধরনের নির্যাতন জুলুমের শামিল। আর যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে। এতে শিশুর শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তার মানসিক নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন চরম অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৮)

অতএব, কোনো শিশুর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার ওপর নির্যাতন করা ইসলামের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


শিক্ষকতার দায়িত্ব আমানতের

একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেন না, তার আচরণও শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে আবাসিক বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। ফলে সেখানে দায়িত্বশীলতার মাত্রাও বেশি হওয়া প্রয়োজন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)

শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও কল্যাণও শিক্ষকের দায়িত্বের অংশ। সেই দায়িত্বের অপব্যবহার করা শুধু আইন ও নৈতিকতার লঙ্ঘন নয়, আমানতেরও খেয়ানত।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯৭)

শিশুর সঙ্গে তাই কঠোরতা, ভয় দেখানো বা নির্যাতন নয়; বরং মমতা, শৃঙ্খলা ও নিরাপদ আচরণই হওয়া উচিত শিক্ষকের দায়িত্বের অংশ।

অপরাধের পথ বন্ধ করার শিক্ষা

শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ অনেক সময় অনিরাপদ পরিবেশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাবের সুযোগে ঘটতে পারে। তাই শুধু অপরাধ ঘটার পর শাস্তির ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; অপরাধের সুযোগ কমিয়ে আনাও জরুরি।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতার নিকটেও যেয়ো না।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৫১)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩২)

‘কাছেও যেয়ো না’—এই নির্দেশনার মধ্যে প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। অর্থাৎ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে অপরাধের অনুকূল পরিবেশ, সুযোগ ও আচরণ থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন।

অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য

শিশু নির্যাতন কোনো একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মাদ্রাসা—যেকোনো প্রতিষ্ঠানে এমন অপরাধ ঘটতে পারে। তাই একটি ঘটনার দায় পুরো একটি প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন সঠিক নয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার নামে অপরাধ গোপন করাও অন্যায়।

অপরাধীর সামাজিক অবস্থান, পেশা বা ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানের করণীয়

ইসলামের নৈতিক শিক্ষা বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

১. শিশু সুরক্ষা নীতিমালা
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে স্পষ্ট ও লিখিত নীতিমালা থাকা দরকার। শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—সবাইকে এসব নিয়ম সম্পর্কে জানাতে হবে।

২. একান্তে থাকার সুযোগ কমানো
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে অপ্রয়োজনে বন্ধ কক্ষ বা নির্জন স্থানে একা থাকার পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে হবে। শ্রেণিকক্ষ ও অন্যান্য স্থান নিরাপদ ও দৃশ্যমান রাখা প্রয়োজন।

৩. নিয়োগে যথাযথ যাচাই
শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের সময় শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, তাদের পূর্ববর্তী কর্মজীবন ও আচরণ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্যও যাচাই করা উচিত।

৪. আবাসিক ব্যবস্থায় তদারকি
মাদ্রাসা বা অন্যান্য আবাসিক প্রতিষ্ঠানে হোস্টেল, করিডর, সিঁড়ি ও অন্যান্য জায়গায় পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে নজরদারি করতে গিয়ে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও রক্ষা করতে হবে।

৫. শিক্ষকদের সুস্থ কর্মপরিবেশ
বিশেষ করে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়মিত ছুটি, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ থাকা দরকার। একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

৬. সহজ ও গোপনীয় অভিযোগব্যবস্থা
কোনো শিক্ষার্থী যাতে ভয়, লজ্জা বা চাপের কারণে নির্যাতনের কথা গোপন না করে, সে জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অভিযোগ পাওয়ার পর নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি যাচাই করতে হবে।

৭. অপরাধ ধামাচাপা নয়
প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে কোনো গুরুতর অভিযোগ গোপন করা উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।


পরিবারকেও হতে হবে সচেতন

শিশু সুরক্ষায় পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয়, কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে অনীহা, অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক অস্বস্তি দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

শিশুকে ভয় দেখিয়ে বা দোষারোপ না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা প্রয়োজন। কোনো নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে শিশুর ওপর চাপ না দিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনগত সহযোগিতার ব্যবস্থা করা উচিত।

একটি শিশুর শৈশবে তৈরি হওয়া ক্ষত অনেক সময় দীর্ঘদিন তার সঙ্গে থেকে যায়। তাই অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শুরু থেকেই শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

কওমি বা আলিয়া মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কোথাও শিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা উচিত নয়। ইসলামের শিক্ষা আমাদের জুলুম থেকে বিরত থাকতে, আমানত রক্ষা করতে এবং দুর্বলদের প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে বলে।

শিশুর নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার। সেই অধিকার রক্ষা করা পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পুরো সমাজের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  শিশু নির্যাতন  ইসলাম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: