২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন পর্যন্ত বাংলাদেশ পার করে এক অনিশ্চিত তিন দিন। বাইরে তখন বিজয়ের উচ্ছ্বাস, আর ভেতরে চলছিল ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের কঠিন আলোচনা।
সরকার পতনের আগেই ছাত্রনেতারা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। তবে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যায় যে অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।
৫ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ফজলে এলাহী আকবর জানান, সেনাপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন। সেনাপ্রধান তাকে বলেন, ‘আমি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বর্তমান পরিস্থিতির একটা সুরাহা করতে চাই।’
এরপর তিনি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে সেনাসদরে ডেকে পাঠানো হয়। প্রথমে তিনি আতঙ্কিত হলেও পরে জানতে পারেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য তাকে ডাকা হয়েছে।
দুপুরের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ক্যান্টনমেন্টে জড়ো হন। তখন মূল আলোচনা ছিল সংসদ ভেঙে দিয়ে কীভাবে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা যায়। জরুরি অবস্থা বা সামরিক সরকারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘তখন শুধু সরকার গঠনের বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছিল, নির্বাচনের কথা তখনো ওঠেনি।’
বিকেলে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান দেশ ছাড়ার পর সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এরপর রাজনৈতিক নেতারা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেখানে খালেদা জিয়ার মুক্তি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ বাহিনীর ভবিষ্যৎ ভূমিকা, বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যবস্থা এবং গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরের বিষয়েও আলোচনা হয়।
ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকেও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়। তারা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল অংশীদার শিক্ষার্থীদের মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
এরপর শুরু হয় নতুন সরকারের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া। ছাত্রনেতারা শুরু থেকেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চেয়েছিলেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, ১ আগস্ট থেকেই ছাত্ররা ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘নামটা আমাদের কাছ থেকেই এসেছিল।’
৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেন। কয়েক দফা আলোচনার পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিতে সম্মতি জানান।
৬ আগস্ট ছাত্রনেতারা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নির্বাচনেও ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নেওয়া হয়।
অবশেষে ৮ আগস্ট রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা। এর মধ্য দিয়ে সরকারবিহীন তিন দিনের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সময়ের আলো/এমকে