‘খাই খাই’ বন্ধ করে দল ও মানুষের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়ে নেতাকর্মীদের কড়া বার্তা দিয়েছেন, ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাহারা দেওয়া, তাদের পক্ষে ওকালতি করা, বাড়িঘর পাহারা দেওয়া, ঠিকাদারি কাজ পাহারা দেওয়া এবং টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিএনপিতে যোগদান করানোর মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই ঝালকাঠির রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। তার পোস্টের মন্তব্যের ঘরে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ঝালকাঠির বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের খাই খাই বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি। ছয় মাসে অনেক খেয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাহারার বিনিময় খেয়েছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে ওকালতি করে খেয়েছেন, আওয়ামী লীগের বাড়িঘর পাহারা দিয়ে খেয়েছেন, ঠিকাদারি পাহারা দিয়ে খেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের দলে যোগদান করিয়েও খাচ্ছেন।’
পোস্টের তিনি আরও লেখেন, মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন। লজ্জা থাকা উচিত। যাদের রক্তের বিনিময়ে আপনাদের এত খাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেই ‘৩৬ জুলাইয়ের শহিদদের’ জন্য ৫ আগস্ট একটু দোয়া-মোনাজাতও করতে পারেননি।
এতে তিনি আরও লেখেন, শুধু নেতা হতে পদের আকাঙ্ক্ষায় থাকলে দ্রুতই দল থেকে ঝরে পড়বেন।
এমপির এমন পোস্টের পর তার ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যের ঘরে নেতাকর্মীদের মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। কেউ এমপির বক্তব্যকে সমর্থন করলেও কেউ কেউ তার নিজের চারপাশের নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কিরন নামে একজন এমপির পোস্টে মন্তব্য করে লেখেন, ‘এমপি সাহেব, আপনিতো সেই খাই, খাই নেতাকর্মীদের নিয়ে চলাফেরা করেন। আপনি রাজাপুরে আসলে আপনাকে রিসিভ করতে যায়, আপনার বাড়ি পর্যন্ত চলে যায়, আপনার সাথে ক্যামেরায় ছবি তুলে তেল মেরে আপনার নাম বিক্রি করে চাঁদাবাজি করে। এইসব মীরজাফর আপনার পাশে থাকলে উন্নত হবে? আড়ালে খোঁজ নিয়ে দেখুন, বাস্তবতা জানতে পারবেন আশা করি।’
এসএম নাজমুন মিরাজ নামে একজন মন্তব্য করেন, ‘ভাইয়া, দুইদিন পরে দলে কর্মী খুঁজে পাবেন না। কারণ যে কয়টা নেতা বানাইছেন, সবগুলো কর্মীদের সাথে বেঈমানি করে আওয়ামী লীগরে পুনর্বাসন করছে ঝালকাঠিতে, স্বার্থের অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে।’
রুমি আকন নামে একজন মন্তব্য করেন, জেলা থেকে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যন্ত খাই খাই পার্টিরা এগিয়ে আছেন। কাঁঠালিয়া উপজেলার পাটিখালঘাটা ইউনিয়নে আপনি ১২টি প্রজেক্টসহ মসজিদের অনেক কাজ দিয়েছেন। কিন্তু তিতা হলে সত্যি যে, যাদেরকে আমরা মিটিং-মিছিলে পাশে পাইনি, উল্টো দলের এবং সরাসরি এমপি মহোদয়ের দুর্নাম বলতো, তাদের নামও কয়েকটি প্রজেক্টে আসছে।
এদিকে এমপির ওই পোস্টের পর তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে আশ্রয় দিয়েছেন রফিকুল ইসলাম জামাল। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ সমর্থিত একাধিক চেয়ারম্যানকে টাকার বিনিময়ে পরিষদে বহাল রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া জেলা ওলামা লীগের সদস্য সচিব নেয়ামত উল্লাহকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর টাকার বিনিময়ে বিএনপিতে এনে কাঁঠালিয়া উপজেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক বানিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এমপির বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা, মিটিং ও মিছিলের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন।
এমপির ফেসবুক পোস্টের পর আবির আহমেদ তুরাগ নামে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা পোস্ট দিয়ে তার সমালোচনা করেন।
তিনি লেখেন, ভাবা যায়? যে নেতা নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের মানুষজনদের লাইনে দাঁড় করায়া, তাজা গাঁদা ফুলের মালা গলায় পরায়া বুকে টাইনা নিয়া দল ভারী করলো, আবার নির্বাচনি প্রচারণায় বক্তব্য দিতে গিয়া কইলো ১২ তারিখ নির্বাচনের পর কোনো সন্ত্রাসী সাথে রাখবে না।
রফিকুল ইসলাম জামালের এমন প্রকাশ্য বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি মন্তব্যের ঘটনায় ঝালকাঠির বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের ‘খাই খাই’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন এমপি নিজেই। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন, দলীয় পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়াসহ নানা অভিযোগ তুলছেন দলেরই নেতাকর্মী ও সমালোচকরা।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএনপি সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/কেএইচও