ড. তৌহিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক। একই সঙ্গে একজন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ। তিনি দেশের বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা, সামাজিক সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রতিকার বিষয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত মতামত ও বিশ্লেষণ দিয়ে থাকেন। অতিসম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গৃহীত ব্যবস্থার কার্যকারিতাসহ নানা বিষয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার জাহেদুল ইসলাম আরিফ।
সময়ের আলো : মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার কারণ কী?
ড. তৌহিদুল হক : কোনো এলাকা এক দিনে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে না। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অপরাধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। অপরাধের ধরন, মামলার সংখ্যা, অপরাধীদের সক্রিয়তা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গৃহীত ব্যবস্থার কার্যকারিতা, সবকিছু বিবেচনায় অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মোহাম্মদপুরকে দীর্ঘ সময় ধরে একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আবার একটি এলাকাকে ‘রেড জোন’ থেকে বের করে আনাও এক দিনে সম্ভব নয়। এর পেছনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কিছু স্থায়ী ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে। এসব কারণে মোহাম্মদপুরের অপরাধপ্রবণতা শুধু ঢাকার অন্যান্য এলাকার তুলনায় নয়, অনেক ক্ষেত্রেই দেশের অন্যান্য অপরাধপ্রবণ এলাকার তুলনায়ও বেশি দৃশ্যমান।
এ এলাকায় সংঘটিত অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে ঘুরেফিরে জেনেভা ক্যাম্পের নাম চলে আসে- এর কারণ কী? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধীদের রুখতে পারে না কেন?
মোহাম্মদপুরের অপরাধপ্রবণতার অন্যতম বড় কারণ জেনেভা ক্যাম্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাধ চক্র। দীর্ঘদিন ধরে এ ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অপরাধের বলয় তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশের অপরাধের উৎসও এই ক্যাম্পকে ঘিরেই। এই এলাকাকে কেন্দ্র করে তিন ধরনের অপরাধ সবচেয়ে বেশি সংঘটিত হয়, মাদক, অবৈধ অস্ত্র এবং বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আত্মগোপন। আর এখানে শুধু মাদক বিক্রি নয়, মজুদ রাখা, সরবরাহ করা এবং সেবনের ব্যবস্থাও করা হয়। অপরাধ চক্রের সদস্যরা নারী, কিশোর, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিশুদেরও মাদক পরিবহন ও বিক্রির কাজে ব্যবহার করে। বিভিন্ন সূত্রে এমন তথ্যও পাওয়া যায় যে, অনেক পরিবারের একাধিক সদস্য কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
এ ছাড়া অস্ত্র মজুদ ও বেচাকেনার ক্ষেত্র হিসেবেও এই এলাকা বহুবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের প্রশ্নে জেনেভা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি অংশ আত্মগোপনের জন্যও এই এলাকাকে ব্যবহার করে। ঘনবসতি এবং জটিল আবাসিক কাঠামোর কারণে সেখানে আত্মগোপনকারীদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
অপরাধ সংঘটনে মাদকের ভূমিকা কতখানি?
মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি আরও বহু অপরাধের জন্ম দেয়। মাদকের সঙ্গে যৌন সহিংসতা, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এসব অপরাধের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কে কোন এলাকায় মাদক বিক্রি করবে, কার নিয়ন্ত্রণে কোন এলাকা থাকবে, অর্থের ভাগাভাগি কীভাবে হবে, এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেও সংঘাত সৃষ্টি হয়।
এ এলাকার অপরাধ চক্রের সদস্যরা বেশিরভাগই কিশোর- কেন?
মোহাম্মদপুরে সুবিধাবঞ্চিত পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অনেক পরিবার সন্তানদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারছে না। আবার অনেক কিশোরই লেখাপড়ার বাইরে। ফলে তারা খুব সহজেই অপরাধ চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। আর বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে এসব কিশোরকে নিয়ে গড়ে তুলছেন কিশোর গ্যাং। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, এলাকায় আধিপত্য, চাঁদাবাজি, জমি দখল কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর মতো কাজে এসব কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করা হয়।
এ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ও দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। আপনার বিশ্লেষণ কী?
শুধু অপরাধীরাই নয়, চাঁদাবাজির শিকার কিছু নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য কিশোরদের নিয়ে আলাদা বলয় তৈরি করছেন। অনেকেই মনে করেন, অল্প খরচে কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং তারা সহজেই নির্দেশ পালন করে। ফলে আত্মরক্ষার নামে আরেকটি শক্তি তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত অপরাধের চক্রকেই আরও শক্তিশালী করছে।
অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস পাচ্ছে কেন?
একসময় মোহাম্মদপুরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অপরাধের বিরুদ্ধে সরব থাকলেও এখন সেই প্রতিরোধ অনেকটাই দুর্বল। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করছে। ছিনতাইয়ের সময় সামান্য বাধা পেলেই হামলা করছে। এ কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে ভয় পান। আগে রাতে অপরাধের আশঙ্কা বেশি থাকলেও এখন মোহাম্মদপুরে ২৪ ঘণ্টাই মানুষ অনিরাপত্তায় থাকে। যেকোনো সময় যে কেউ অপরাধের শিকার হতে পারেন।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের ভূমিকার প্রসঙ্গে কিছু বলবেন কি?
অভিযোগ রয়েছে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি নানা সময় অপরাধীদের সহযোগিতা করেন। কখনো আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে, আবার কখনো মামলার বর্ণনায় অপরাধের প্রকৃত ভয়াবহতা যথাযথভাবে তুলে না ধরার মাধ্যমে। গুরুতর অপরাধের মামলাও যদি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে সহজে জামিন পাওয়া যায়, তা হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একজন অপরাধী যখন বারবার অপরাধ করেও সহজে জামিন পায় অথবা মনে করে প্রভাব ও অর্থের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার একটি অংশকে প্রভাবিত করা সম্ভব, তখন তার মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে যায়। সেই অপরাধী আরও সংঘবদ্ধ ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
কী উপায়ে এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যেতে পারে?
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়। মোহাম্মদপুরের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অপরাধসংক্রান্ত নানা বাস্তবতার সমন্বিত ফল এটি। শুধু অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, কিশোরদের পুনর্বাসন, সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি নিশ্চিত করে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই ধীরে ধীরে মোহাম্মদপুরকে ‘রেড জোন’ থেকে সবুজ জোন অর্থাৎ নিরাপদ এলাকায় পরিণত করা সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/এসএকে