ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসির জাদুকরী পায়ের কারিকুরি দেখে মুগ্ধ হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। একের পর এক রেকর্ড, অসংখ্য শিরোপা আর অতুলনীয় ফুটবলশৈলীতে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে। কিন্তু এই মহাতারকার গল্পের শুরুটা কেমন ছিল?
লিওনেল মেসির শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। শৈশবে মেসিকে স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন ছিলেন, তার বাবা হোর্হে মেসি।
ছেলের প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ করে দিতে নিজের জীবনের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেছিলেন হোর্হে। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং ছেলের প্রতি অবিচল বিশ্বাস—সবকিছু মিলিয়েই তিনি ছিলেন মেসির পথচলার অন্যতম প্রধান সহযাত্রী। মাঠে মেসি যখন একের পর এক গোল করে আলো ছড়িয়েছেন, তখন আড়ালে থেকে তাকে আরও ভালো হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তার বাবা।
মেসির কাছে তাই হোর্হে শুধু বাবা নন; তিনি ছিলেন মেন্টর, সমালোচক এবং সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা আজও নিজের সন্তানদের বড় করার ক্ষেত্রে অনুসরণ করেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বাবাকে নিয়ে মেসির নানা স্মৃতিচারণ উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘ওলে’-তে। সেখানে বাবার কঠোর সমালোচনা, কর্মব্যস্ত জীবন, ফুটবল নিয়ে তাদের আলোচনা এবং নিজের উন্নতির পেছনে বাবার ভূমিকার কথা বলেছেন মেসি।
বাবার গঠনমূলক সমালোচনার কথা বলতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আমার বাবা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি আমার ব্যাপারে ভীষণ কঠোর সমালোচক ছিলেন। সেটিই আমাকে সবসময় আরও ভালো করার তাগিদ দিত। অবশ্য তিনি জানতেন, আমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক।’
তবে বাবার কঠোরতার বিপরীতে মায়ের ভালোবাসার কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তার ভাষায়, ‘আমার মায়ের কাছে আমিই সবসময় সেরা—এমনকি আমি যখন জঘন্য খেলতাম তখনও! মায়ের চোখে আমি প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলি, কোনো কিছুতেই আমার দোষ থাকে না। আর দশটা মায়ের মতোই উনি।’
হোর্হের কঠোর পরিশ্রমের কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তিনি বলেন, বাবার অনেক স্বভাবই নিজের মধ্যে পেয়েছেন। তবে কাজের ব্যস্ততার কারণে বাবাকে খুব বেশি সময় কাছে পেতেন না।
মেসির ভাষায়, ‘উনি সারাদিন কাজ করতেন বলে আমাদের সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতে পারতেন না। ভোর ৪টায় উঠতেন এবং রাতের খাবারের সময় বাড়ি ফিরতেন। যখনই দেখা হতো, উনি সেই সময়টা বেশ উপভোগ করতেন। কখনো আমার ওপর চিৎকার পর্যন্ত করেননি। আমি ওনাকে খুব মিস করতাম।’
বাবার সেই জীবনযাপন মেসির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিজের সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারাকে তাই সৌভাগ্য মনে করেন তিনি। সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে নিজের বাবা-মায়ের কাছ থেকেই শেখার চেষ্টা করেন বলেও জানিয়েছেন মেসি।
ফুটবল ছিল মেসি ও তার বাবার সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতু। হোর্হে নিজেও ফুটবল দেখতে ও খেলতে ভালোবাসেন। ছেলের বার্সেলোনা এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ম্যাচ নিয়েও দুজনের আলোচনা হতো।
মেসি বলেন, ‘হোর্হে ফুটবল দেখতে ও খেলতে ভীষণ ভালোবাসেন। আমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। বার্সেলোনা এবং জাতীয় দলের হয়ে আমার ম্যাচগুলো নিয়ে আমাদের কথা হয়, ব্যাস অতটুকুই। তিনি ফুটবল ভালোই বোঝেন... (হেসে)। ব্যক্তিজীবন এবং দলগতভাবে—দুই ক্ষেত্রেই আমরা বিষয়গুলোকে বেশ একইভাবে দেখি।’
মেসি যত বড় তারকা হয়েছেন, বাবার চোখে ততটা ছাড় পাননি। বরং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও হোর্হে তাকে ভুলগুলো মনে করিয়ে দিতেন।
মেসির স্মৃতিতে, ‘ধরা যাক আমি একটা অসাধারণ ম্যাচ খেলেছি, তবুও তিনি আমাকে বলতেন, ‘তুই তো একটা সুযোগ মিস করেছিস!’ এই বলে আমাকে একটু খেপিয়ে দিতেন। এতে আমার ভালোই লাগত। নিজের ভুল শুধরে আরও ভালো করার জেদ বা তাগিদ পেতাম। আমরা দুজনেই নিজের কাজের কঠোর সমালোচক।’
মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পে তাই গোল, শিরোপা কিংবা ব্যক্তিগত পুরস্কারের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে একজন বাবার নীরব ত্যাগের গল্পও। হোর্হে মেসির কঠোর পরিশ্রম, সমালোচনা ও নিরন্তর সমর্থন ছোট্ট লিওনেলকে ধীরে ধীরে পরিণত করেছে বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকায়। মাঠের বাইরে বাবার সেই ছায়া আজও মেসির স্মৃতিতে অমলিন।
সময়ের আলো/এসএকে