কয়েকদিন আগেও সোনার বাজারে দাম কমছিল। এতে ভোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে বিশ্ববাজারে সোনার দাম হঠাৎ করেই প্রায় ১০০ ডলার বেড়েছে, গত ১৭ জুনের পর সর্বোচ্চ। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে আবার বাড়ানো হয়েছে সোনার দাম। দামের এই উত্থানের পেছনে কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিশ্ববাজারে স্পট সোনার দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ট্রয় আউন্স ৪ হাজার ৩৩৬ দশমিক ২ মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। দিনের একপর্যায়ে দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। সপ্তাহের হিসাবে সোনার দাম বেড়েছে ৭ শতাংশের বেশি। গত জানুয়ারির পর এটিই সোনার দামে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উত্থান।
এর আগে, ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম উঠেছিল রেকর্ড উচ্চতায়। তখন প্রতি ট্রয় আউন্স সোনা বিক্রি হয়েছিল ৫ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি দামে।
শুক্রবারের আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৩৩৬ দশমিক ২ ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় দাম দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
এক ট্রয় আউন্সে ২ দশমিক ৬৭ ভরি ধরে হিসাব করলে, প্রতি ভরি স্পট সোনার দাম দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১ হাজার ১২৩ টাকা। অর্থাৎ, একদিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ভরি সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ টাকা।
উল্লেখ্য, এটি আনুমানিক হিসাব। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ও ডলারের দাম প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। তাই এর স্থির মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন।
দাম বাড়ার কারণ কী?
হঠাৎ করে সোনার দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে কৃষি খাতের বাইরে দেশটির কর্মসংস্থান ২৩ হাজার কমেছে।
এর আগে জুনে কর্মসংস্থান ২০ হাজার বাড়ার যে হিসাব দেওয়া হয়েছিল, সেটিও পরে কমিয়ে আনা হয়েছে। এমন দুর্বল কর্মসংস্থানের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী বৈঠকে সুদের হার বাড়ানোর সুযোগ কতটা আছে।
সুদের হার কমা বা বাড়ানোর সম্ভাবনা সোনার বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। কারণ, সোনা কোনো সুদ দেয় না। সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীদের কাছে সুদনির্ভর সম্পদ তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সুদের হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে সোনার মতো সুদহীন সম্পদের আকর্ষণ বাড়ে।
সোনার দামের সাম্প্রতিক উত্থানে আরেকটি বিষয় ভূমিকা রাখছে। সেটি হলো অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাওয়া।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এতে তেলের দাম কমেছে। তেলের দাম কমলে মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমতে পারে। ফলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য উচ্চ সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে রাখার চাপ কমে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে দুর্বল ডলারের সম্ভাবনা যুক্ত হলে, সোনার দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এদিকে, সোনার বাজারে দামের বড় ওঠানামা থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা কমেনি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২৮৮ দশমিক ৯ টন সোনা কিনেছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় যা ৬২ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। এই চাহিদা সোনার দীর্ঘমেয়াদি দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক দরপতনের পর সোনার বাজারে আবার বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক।
জেফরিজের গ্লোবাল হেড অব ইকুইটি স্ট্র্যাটেজি ক্রিস্টোফার উড এবং হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক জন পলসনের মতে, সোনার দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ‘কাগুজে মুদ্রার ওপর মানুষের আস্থা কমতে থাকলে বিকল্প সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়বে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও সোনার চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পলসন।
তবে, শুধু সোনার বার বা ধাতু কেনার বদলে বড় সম্ভাবনাময় সোনার খনি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেও বেশি লাভের সুযোগ থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
কতটা বাড়তে পারে সোনার দাম?
সোনার দাম এখন কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান দামে সোনা বৈশ্বিক অর্থনীতির মাঝারি প্রবৃদ্ধি, কিছুটা কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমিত নীতিগত কড়াকড়ির প্রত্যাশার সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সোনার দাম কিছু সময় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির পরিস্থিতি খারাপ হলে চিত্র বদলে যেতে পারে।
নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে, নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে। একইভাবে, সুদের হার কমার প্রত্যাশা জোরালো হলে সোনার বাজারে নতুন গতি আসতে পারে।
এছাড়া, দরপতনের পর বিনিয়োগকারীরা বড় পরিসরে সোনা কিনতে শুরু করলেও দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৫০০ ডলার বা তারও বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সূত্র : দ্য ইকোনমিক টাইমস, গোল্ড প্রাইস
সময়ের আলো/মহু