মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধ বন্ধের নতুন ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রোববার (৯ আগস্ট) ইসরায়েলি সরকারের ডানপন্থী মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
নেতানিয়াহুর এমন অবস্থানের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলা কার্যত কমে এসেছে। গত সোমবারের পর থেকে সেখানে হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে ইসরায়েল।
ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মূল বিরোধ দেখা দিয়েছে এর বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করলে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে ধাপে ধাপে সরে যাবে এবং আন্তর্জাতিক একটি স্থিতিশীলতা বাহিনী নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশের সঙ্গে মিলে গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।
তবে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছেন, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ১৫ দফার নথি গ্রহণ করছে না।’ তিনি আরও বলেন, হামাসের ভারী, হালকা— সব ধরনের অস্ত্র সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী কোনো প্রত্যাহার করবে না।
নেতানিয়াহু জানান, এ পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রস্তাব ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় এবং সেসব বিষয়ে ইসরায়েল নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের গাজা বিষয়ক ‘বোর্ড অব পিস’-এর যুদ্ধবিরতি তদারককারী প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এন১২-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হামাসের অস্ত্র জব্দ করে অকার্যকর করে দেওয়ার পর গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে।
হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম রয়টার্সকে বলেন, ১০ দিন আগে কায়রোতে যে রোডম্যাপে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল, হামাস এখনো সেটির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কারণে’ নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার যাতে প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত না করে, সে জন্য মধ্যস্থতাকারী ও যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে হবে।
তবে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ নেতানিয়াহুর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মূল লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলাম—হামাসকে ধ্বংস করা।’ গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ‘এক মিলিমিটারও’ সরে যেতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত মাসে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, গাজা যুদ্ধ অবসানের পরিকল্পনায় বড় অগ্রগতি হয়েছে এবং ইসরায়েল ও হামাস এতে সম্মত হয়েছে। পরিকল্পনায় হামাসের অস্ত্র সমর্পণের বিনিময়ে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে।
তবে হামাস ‘নিরস্ত্রীকরণ’ শব্দটি ব্যবহার করছে না। সংগঠনটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত একটি ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করতে তারা সম্মত হয়েছে। ওই প্রশাসন ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে গাজার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
হামাসের দাবি, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়া ঠেকাতেই তারা পরিকল্পনাটিতে সম্মতি দিয়েছে। তবে চুক্তি বাস্তবায়ন ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি—বিশেষ করে সেনা প্রত্যাহার ও হামলা বন্ধের—ওপর নির্ভর করবে।
ইসরায়েল জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় অংশ নেওয়া হামাস যোদ্ধাদের খুঁজে বের করার অভিযান চালানো হবে। তবে গত সোমবার থেকে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা বন্ধ করেছে দেশটি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। নিহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। হামাস তাদের কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছে, সে সংখ্যা প্রকাশ করেনি। এ সময়ে গাজায় চার ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সেনারা বর্তমানে গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করে রেখেছে এবং সেসব এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির প্রায় সবাই উপকূলীয় একটি ছোট এলাকায় আটকা পড়ে আছেন। তাদের বেশির ভাগই অস্থায়ী তাঁবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন।
সময়ের আলো/কেএইচ