আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রধান উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের সম্মেলন। সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে যোগ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নানা সমীকরণের এ পর্যায়ে অনুকূল পরিবেশ উদ্ভবের চিন্তা থেকে শেষ মুহূর্তে দিল্লি সফরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফর করলে তার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে আমন্ত্রণের ভাষা ও পদ্ধতি নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যে ইতিবাচক সুরাহার ইঙ্গিত মিলেছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সবশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী ঢাকা-দিল্লি উভয় পক্ষই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী। কেননা যেখানে দুই দেশের সীমান্ত একে অন্যের সঙ্গে লাগোয়া সেখানে কোনো পক্ষই একা একা এগিয়ে যেতে পারে না, উভয়েরই উন্নতিতে একে অন্যের সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব প্রয়োজন। দিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং তাকে ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেওয়ায় ঢাকা চটেছে।
এই ঘটনায় ঢাকা বিবৃতি প্রচার করে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গত সোমবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করেছেন। ওই সাক্ষাতের আগের দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমস্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন খুঁটিনাটি ও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।
দিল্লি সফরের জন্য ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দুই ধরনের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এক. ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর সরকার গঠনের পরপরই ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরের জন্য রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ জানায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান যে ভারতের এই আমন্ত্রণটি ঢাকা দেখছে, সময়-সুযোগ অনুযায়ী সফর হবে। দুই. আগামী সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে যোগ দেওয়ার জন্য বিমসটেকের (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় আপত্তি তুলেছে ঢাকা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি সফর করতে পারেন। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কেননা আস্তে আস্তে দুপক্ষের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। দুপক্ষের মধ্যে আলাপ কিন্তু বন্ধ ছিল না। যেটি ছিল যে ঢাকা সবসময়েই গঠনমূলক আলোচনা করতে চেয়েছে কিন্তু দিল্লির আচরণ ছিল সংকট জিইয়ে রাখার মতো।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় দূতের সাক্ষাতের পর ঢাকা মনে করছে, দিল্লি তার আচরণে পরিবর্তন আনছে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে মর্যাদা ও সুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরপরই ভারতীয় দূতের দিল্লি যাত্রা বার্তা দেয় যে দিল্লির হয়তো টনক নড়েছে। যা চলমান আগস্টের শেষদিকে আরও দৃশ্যমান হতে পারে। আসলে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। আর কূটনীতি রাজনীতির বাইরের কিছু নয়। রাজনীতিকে মসৃণ গতিতে এগিয়ে নিতেই কূটনীতি। আবার কূটনীতিকে রাজনীতির বাহনও বলা যায়। এ কারণে শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী ব্রিকস আউটরিচ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর ও আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত সোমবার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বিমসটেকের দাওয়াত দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছে চেয়ারপারসন অব বিমসটেক। এ পার্থক্যটা আপনারা বোঝার চেষ্টা করেন। আমরা এখনও এ বিষয়ে (বিমসটেক ইস্যুতে ভারত সফর) কোনো নীতি... এ সিদ্ধান্ত নেইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছেন এবং সেই চিঠিটি আমাদের সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল, সেখানে তিনি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেটি আমরা দেখব কোনো একসময়ে।’
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিমসটেক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত যে পদ্ধতিতে আমন্ত্রণ করেছে তা ঢাকার পছন্দ হয়নি। তবে ঢাকা সেই আমন্ত্রণ সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তারা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। অর্থাৎ এখনও সম্ভাবনা আছে। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর দিল্লিতে গিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সম্পর্কের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতেই দিল্লি গেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে ‘রিঅ্যালাইন’ করতে হবে। আমাদের তো প্রতিবেশী পাল্টানো সম্ভব নয়। বন্ধু পাল্টানো যায়- পররাষ্ট্রনীতিতে এমন কথা বলা হয়। তাই আমাদের এনগেজ করতে হবে। আমাদের সম্পর্ক নতুন করে রিঅ্যালাইন করতে হবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে তা হতে হবে দুই স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে। আগে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিল, সেখানে নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল। ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তৈরি হতে হবে।
এদিকে ভারত জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, পৃথক দুই উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পত্র পাঠানো হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক গতকাল সোমবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তুলে সেখানে আলোচিত বিষয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যেতে রাজি হয়েছেন কি না তা জানতে চান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গতকাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের হাইকমিশনারের একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা হয়। আপনি (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে) আমন্ত্রণের যে ব্যাপারটি উল্লেখ করলেন, আমরা একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফর এবং দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ বিষয়ে আমরা আপনাদের আরও পরবর্তী তথ্য জানাব।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন যেন আর কাটছেই না। আমরা যেন এক পা এগিয়ে দু পা পিছিয়ে যাচ্ছি। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ভারতের দিক থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, ভারত বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে এনগেজড হতে চায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যোগ দেন। খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে শোক প্রকাশ করেন। ভারতের লোকসভাতেও শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। বাংলাদেশে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর ভারত শুধু অভিনন্দনই জানায়নি, নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছিল, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত সক্রিয় হবে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ভারতের বন্দরগুলোয় ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পায়, জ্বালানি সংকটের সময় জ্বালানি সহায়তা পায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভা নির্বাচনের পর থেকে সীমান্ত হত্যা এবং পরে পুশইন চেষ্টার মধ্য দিয়ে ভারত পুনরায় পুরোনো বৈরিতায় পাকাপোক্তভাবে ফিরে যায়। ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অমীমাংসিত অবস্থায় আছে। আমাদের সেসব নিয়ে শিগগির আলোচনা করতে হবে। সীমান্ত উত্তেজনা বাংলাদেশকে ওইসব ইস্যুতে চাপে রাখার ভারতীয় কৌশল হতে পারে। আমাদের যতবেশি সম্ভব আলোচনা করতে হবে। অর্থাৎ যত সমস্যা, তত আলোচনা। যেখানে যতটুকু আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায়, ততটুকু সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি