দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অধ্যায় চলছে। সময়টা ছিল ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট। ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের এক প্লুটোনিয়াম বোমা নিক্ষিপ্ত হলো জাপানের নাগাসাকি শহরে। এই পরমাণু বোমা হামলাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটায়। কিন্তু কেন এই বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া উপায় ছিল না তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এ নিয়ে মার্কিন পদার্থবিদ ফিলিপ মরিসনের বিবরণ ও ঐতিহাসিক দলিলগুলো থেকে একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিবিসি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি মরিসনের বরাতে লিখেছে, যুদ্ধ শেষ করার জন্য পারমাণবিক বোমা ছিল তখনকার পরিস্থিতিতে একপ্রকার অনিবার্য পছন্দ।
১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। জাপান পটসডাম ঘোষণাপত্র প্রত্যাখ্যান করে এবং মার্কিন মুলুকে আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তখনই এই সিদ্ধান্ত আসে। এ বিষয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন পদার্থবিদ ফিলিপ মরিসন। তিনি বোমা তৈরির ম্যানহাটন প্রকল্পের অংশ হিসেবে লস আলামোস ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন এবং ‘ফ্যাট ম্যান’-এর প্লুটোনিয়াম নিজের কোলে করে ট্রিনিটি পরীক্ষার স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। হামলার ৩০ বছর পর বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘যুদ্ধ তখনও চলছিল। আমরা প্রশান্ত মহাসাগরে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম... তাই এটি থামানো অসম্ভব ছিল।’
যুদ্ধ জয়ে জাপানি ও মার্কিনি উভয়েই তখন মরিয়া। সে সময় আমেরিকায় পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্পটি ছিল বিশাল এক গতিশীল কিন্তু অতিগোপনীয় প্রক্রিয়া। মরিসনের মতে, এটি থামানোর একমাত্র সুযোগ ছিল প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের জীবিত থাকা। কিন্তু ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে তার মৃত্যুর পর, নতুন প্রেসিডেন্ট হন হ্যারি ট্রুম্যান। কিন্তু এই প্রকল্প সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। ট্রুম্যানই হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বা বলা যায় এই হামলার সিদ্ধান্ত নিতেই তাকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। তাছাড়া যুদ্ধকালীন সময়ে প্রকল্পটির বিরাট গতি ও ব্যয় আগে থেকেই এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছিল যেখান থেকে ফিরে আসা মার্কিনিদের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল।
মরিসন বলেন, পারমাণবিক বোমার প্রধান বিকল্প ছিল জাপানের মূল ভূখণ্ডে সামরিক আক্রমণের পরিকল্পনা। যার কোডনাম ছিল ‘অপারেশন ডাউনফল’। সামরিক পরিকল্পনাবিদরা ধারণা করেছিলেন যে এই আক্রমণে শুধু মার্কিন সেনা হতাহতের সংখ্যাই দাঁড়াতে পারে ১০ লাখে। অন্যদিকে, জাপানি সেনা ও বেসামরিক নাগরিক মৃতের সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে ১ কোটিতে পৌঁছতে পারত। আবার কিছু বিশ্লেষক মনে করতেন যে, পূর্ণাঙ্গ সামরিক আক্রমণে জাপানের মোট ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাতে পারতেন।
তিনি আরও জানান, এর আগে ওকিনাওয়ার যুদ্ধেই মিত্রবাহিনীর ৮৪ হাজারের বেশি সেনা হতাহত হয়েছিলেন। অন্যদিকে জাপানি বাহিনীর প্রায় ৮৩ হাজার সেনা এবং ৭৫ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছিলেন। এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ চালানোর ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত করেছিল। জাপানের ভূগোল এমন ছিল যে আক্রমণের পরিকল্পনা জাপানিদের কাছে স্পষ্ট ছিল এবং তারা সে অনুযায়ী প্রতিরক্ষাও জোরদার করছিল। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নেতাদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল। হয় ১০ মিলিয়ন মার্কিন সেনার প্রাণের ঝুঁকি নয়তো জাপানের দুটি শহর ধ্বংস করে দাও। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ট্রুমান প্রশাসন দ্বিতীয় পথটিকেই বেছে নেয়।
হিরোশিমায় প্রথম বোমা ফেলার পরও জাপান আত্মসমর্পণ করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, দ্রুত দুইটি বোমা নিক্ষেপ করলে জাপানিরা মনে করবে যে আমেরিকার কাছে প্রচুর পারমাণবিক বোমা রয়েছে এবং তারা তা ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না। যদিও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২য় হামলাটি আরও বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। একটি টাইফুন এসে পড়লে পরবর্তী বোমা নিক্ষেপ সপ্তাহখানিক পিছিয়ে যেত।
মরিসন জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় বোমার মধ্যে কোনো ভিন্নতা ছিল না। মার্কিন সামরিক নেতাদের নির্দেশ ছিল, ‘প্রথমে একটি বোমা ফেলো। তারপর যত দ্রুত সম্ভব পরের বোমাটি ফেলো।’ তিনি জানান, যদিও ওয়াশিংটন থেকে কাউকে এসে প্রথম বোমার প্রভাব দেখে দ্বিতীয়টি থামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতো। কিন্তু তা সেই সময়ে অত্যন্ত দুরূহ ছিল। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো, শুধু দুইটি বোমাই নয়, মরিসনকে আরও বোমা তৈরির পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছিল। এমনকি এক বছর ধরে প্রতি মাসে একটি করে বোমা ফেলার পরিকল্পনাও ছিল।
ইতিহাসের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। তবে ফিলিপ মরিসনের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ১৯৪৫ সালের আগস্টে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার ছিল একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এটি ছিল যুদ্ধের গতিপথ, প্রকল্পের অপ্রতিরোধ্য গতি এবং প্রচলিত আক্রমণের বিকল্পের ভয়াবহতা মিলিয়ে এক জটিল সমীকরণের ফলাফল। মরিসন নিজেও বোমা ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন না। তিনি জনসমক্ষে প্রদর্শনীর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায় মার্কিনিদের মতে সেই ‘আকাশ-কুসুম’ কল্পনা কার্যকর হয়নি। শেষ পর্যন্ত পরমাণু বোমা হামলায় জাপানে কয়েকটি শহর ধ্বংস হয়। হাজার হাজার বেসামরিক প্রাণের বিনিময়ে। এটাই ছিল সেই সময়ের মার্কিন সামরিক কর্তাদের কাছে ‘দুটি মন্দের মধ্যে কম মন্দটি বেছে নেওয়ার কৌশল’।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি