জীর্নশীর্ণ ছোট্ট ঘর। অভাব-অনটনের সংসার। বাবা দিনমজুর, মা গৃহিণী। কিন্তু অভাবের কাছে হার মানেনি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের জবেদপুর গ্রামের তাওহীদ ইসলাম। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে হতদরিদ্র পরিবারের এই মেধাবী সন্তান। তবে, এতে আনন্দের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তাও।
জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও তাওহীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- সে কি ভালো একটি কলেজে ভর্তি হয়ে তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে? ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন কি পূরণ হবে তার?
সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের (পাইলট) বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া তাওহীদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে একজন শিক্ষকের মানবিক উদ্যোগের গল্প। তাওহীদ তখন পড়াশোনা করত জবেদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে। তার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। এসময় সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন (পাইলট) বিদ্যালয়ের মাঠে চলছিল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মহড়া। বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ পলাশ দূর থেকে মাঠের এক পাশে অপরিচিত একটি ছেলেকে বসে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে নাম ও পরিচয় জানতে চাইলে তাওহীদ তার সঙ্গে কথা বলে।
কথা বলার একপর্যায়ে তাওহীদ জানায়, সে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়তে চায় সে। কিন্তু তার বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শাখা চালু না থাকায় বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। তাই সে সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে (পাইলট) ভর্তি হতে চায়। সেইসঙ্গে এও জানায়, পড়াশোনা করার মতো আর্থিক সচ্ছলতাও তার নেই।
অসহায় ছেলেটির কথা শুনে সাড়া দেন শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ। মেধাবী এই শিক্ষার্থী যেন শুধুমাত্র অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন তিনি। অনেক চেষ্টার পর বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে তাওহীদকে নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করানো হয়।
নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাতেও ভালো ফলাফল করে নিজের মেধার প্রমাণ দেয় সে। এরপর এসএসসি পরীক্ষায়ও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে অর্জন করে জিপিএ-৫।
তাওহীদের এই সাফল্যে আনন্দিত শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘তাওহীদ শুধু তার নিজের পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেনি, বিদ্যালয়ের সম্মানও অক্ষুণ্ন রেখেছে। তার ভবিষ্যৎ জীবন সাফল্যে ভরে উঠুক।’
কিন্তু তাওহীদের সামনে এখন আরও বড় পরীক্ষা। এখন তাকে ভালো একটি কলেজে ভর্তি হতে হবে। অথচ দিনমজুর বাবার সামান্য আয়ে সংসারের ব্যয় মেটানোর পর ছেলের কলেজে ভর্তি, শিক্ষা উপকরণ, যাতায়াতসহ পড়াশোনার খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে, জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি তাওহীদ ও তার মা-বাবার চোখে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার ছায়া।
তাওহীদের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়, সেজন্য সমাজের বিত্তবান, শিক্ষানুরাগী, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও মানবিক মানুষের প্রতি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তাওহীদের কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনার দায়িত্ব নেন, তাহলে হয়ত বদলে যেতে পারে তার পুরো জীবন। সুযোগ পেলে তাওহীদ একদিন তার পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের আলো/মহু