খাদ্য নিরাপত্তা, পণ্যের মান ও সনদ নিয়ে জাপান ও চীনের পদক্ষেপে ভারতীয় কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। জাপান ভারতীয় আম আমদানি স্থগিত করেছে। অন্যদিকে জিনগত পরিবর্তিত উপাদান থাকার অভিযোগে তিন ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের আমদানির লাইসেন্স বাতিল করেছে চীন।
ভারতের উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে ফল ও সবজি জীবাণুমুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত রেহমানপুর গ্রামের ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) কেন্দ্রে জাপানি পরিদর্শকেরা মার্চে গেলে সংকটের শুরু হয়। আম রপ্তানির মৌসুম শুরুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ হওয়ার পর পরিদর্শকেরা ধোঁয়ামুক্তকরণ, জীবাণুনাশ ও সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর পরই জাপান ভারতীয় আম আমদানি স্থগিত করে।
৩১ মার্চ জাপানের ইয়োকোহামার উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫ মার্চ বা তার পর ইস্যু করা পরিদর্শন সনদযুক্ত ভারতীয় আমের সব চালান নিষিদ্ধ থাকবে। পরিদর্শকেরা কার্যক্রমের মান উন্নত হয়েছে বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
প্রায় দুই দশকের মধ্যে ভারত-জাপান আম বাণিজ্যে এটি বড় ধরনের প্রথম ধাক্কা। বর্তমানে আলফানসো, কেসার, ল্যাংড়া, বাঙ্গানাপল্লি, চৌসা ও মাল্লিকা— এই ছয় জাতের আম নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এসব আমের প্রধান রপ্তানি মৌসুম এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত।
২০২৫-২৬ সালে জাপান ভারত থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম আমদানি করেছিল। পরিমাণের দিক থেকে বাজারটি খুব বড় না হলেও ভারতীয় রপ্তানিকারকদের কাছে এর গুরুত্ব অনেক। কারণ জাপান তুলনামূলক বেশি দামে আম কেনে এবং দেশটির বাজারে অনুমোদন পাওয়া অন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও পণ্যের মানের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
এদিকে ভারতের আমচাষিরা এমনিতেই কঠিন সময় পার করছেন। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন অঞ্চলে দীর্ঘ তাপপ্রবাহে আলফানসো আমের বড় অংশ নষ্ট হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গড়ে তোলা রপ্তানিকারকেরাও চুক্তি বাতিল ও গুদামে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির আমচাষি রাজেশ পাতিল জানান, জাপানের বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় তিনি বাগান ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় বাজারের তুলনায় জাপানে প্রায় দ্বিগুণ দাম পাওয়া যেত।
আমের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে ভারতের চাল বাণিজ্যেও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ১৭ এপ্রিল জিনগতভাবে পরিবর্তিত উপাদানের চিহ্ন থাকার অভিযোগে তিন ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের আমদানি লাইসেন্স বাতিল করে চীন। তবে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, চাল পাঠানোর আগে অনুমোদিত পরীক্ষাগারে পণ্যগুলো জিএমওমুক্ত হিসেবে সনদ পেয়েছিল।
ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এপিইডিএ) ৮ জুন চীনে পাঠানো চালের জিএমও পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত পরীক্ষাগারের তালিকা প্রকাশ করে। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পরীক্ষাব্যবস্থায় এখনো সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানির বড় অংশ চালনির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি রেকর্ড ১২৫০ কোটি ডলারের চাল রপ্তানি করেছে। ফলে চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এ ছাড়া হংকং কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের কারণে ভারতের কয়েক ধরনের মসলা আমদানি স্থগিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভারতীয় জিরার চালানে পরীক্ষা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থায় ভারতীয় মসলা নিয়ে ৩১২টি সতর্কতা পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কৃষিপণ্য সরবরাহব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা হলো উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পণ্যের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ ও অনুসরণযোগ্যতার ঘাটতি। কৃষক থেকে সংগ্রাহক, এরপর ব্যবসায়ী ও প্রক্রিয়াজাতকারী— এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কীটনাশক ব্যবহারের তথ্য অনেক সময় হারিয়ে যায়।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশটির প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানিও মোট রপ্তানির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচ