আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি। গত চার মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এই লোকসান পূরণে সরকারের কাছে সমপরিমাণ ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত লোকসানের হিসাব ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এ অর্থ চেয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, বিপণন ও বিতরণের প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, জাহাজভাড়া, বীমা ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের ওপর সংস্থাটির লাভ-লোকসান নির্ভর করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় বিপিসি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। তবে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পরিবহন ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয়ও বাড়ে। দেশের বাজারে একই হারে দাম সমন্বয় না হওয়ায় আমদানি ব্যয়ের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রি করতে হয়েছে বিপিসিকে।
বিপিসির হিসাবে, যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানির গড় দাম ছিল প্রায় ৮৬ মার্কিন ডলার। জুনে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে অকটেনের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে তেলের মূল্যের পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি আমদানির কারণে এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সময় দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না হওয়ায় বিপিসির লোকসান আরও বাড়ে। একপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও তা আমদানিতে ব্যয় হচ্ছিল ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে লোকসান ছিল ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।
অকটেন প্রতি লিটার ১২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও আমদানিতে ব্যয় হচ্ছিল ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা। এতে প্রতি লিটারে লোকসান দাঁড়ায় ৩১ টাকা ৬১ পয়সা।
ওই সময় দাম সমন্বয় না করা হলে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল সংস্থাটি। পরে ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়।
তবে দাম বাড়ানোর পরও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় বিপিসির লোকসান থামেনি। মন্ত্রণালয়ের ২৮ জুলাইয়ের চিঠি অনুযায়ী, মার্চে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি এবং জুনে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
চার মাসে মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশের বাজারে সে অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ না দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। তাই মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বিপিসির জ্বালানি তেল আমদানির বিপরীতে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপিসির আর্থিক অবস্থান বেশ শক্তিশালী ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে সংস্থাটি ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এতে ব্যয় হয় ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট জ্বালানি ও কেরোসিন আমদানিতে ব্যয় হয় ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ফার্নেস তেল ও সামুদ্রিক জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয় আরও ৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।
২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। ২০২২ সালে ডলার সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে একবারে প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়। পরে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন, ভর্তুকির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি আশা করছেন, সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিপিসি সরকারকে কর ও মূল্য সংযোজন কর বাবদ প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি একটি তহবিলে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। বিপিসির মুনাফার একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ প্রকল্প ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতেও ব্যবহার করা হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুধু বিপিসির আর্থিক অবস্থাতেই চাপ তৈরি করেনি, সরকারের রাজস্ব ও ভর্তুকি ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/এমকে