দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা সদরের একসময়ের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ওসমানপুর উচ্চ বিদ্যালয়। ভালো ফলাফল ও শিক্ষার সুনামের কারণে উপজেলার শিক্ষাঙ্গণে আলাদা অবস্থান ছিল প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা এখন ইতিহাস। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নামছে তলানিতে। চলতি বছর ১১৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ৭৪ জন। পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদ্যালয়টি থেকে ১২৪ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিল ৫৪ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছিল ৭০ জন। পাসের হার ছিল ৪৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সে বছর কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি।
চলতি বছর পরীক্ষার্থী কমে ১১৬ জন হলেও ফলাফলের অবনতি হয়েছে আরও মারাত্মকভাবে। পাস করেছে মাত্র ৪২ জন আর ফেল করেছে ৭৪ জন। এবারও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা শূন্য। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমলেও ফেলের সংখ্যা বেড়েছে ৪ জন এবং পাসের হার কমেছে ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পরপর দুই বছর অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে— উপজেলা সদরের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির এমন ধসের নেপথ্যে কারণ কী?
ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলাল হোসেনের সঙ্গে কথা বললে তিনি সরাসরি দায় চাপান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ওপর। তার ভাষ্য, বিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না এবং অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের পড়াশোনায় যত্নশীল নন।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষার দুরাবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধান শিক্ষক বলেন, শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ছাত্রদের যোগ-বিয়োগ করতে দিলে তারা পারে না, এখানে আমি কী করব?
এমনকি অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপের বিষয়েও কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নোটিশ দেওয়া হলেও অভিভাবকরা আসেন না জানিয়ে তিনি বলেন, বই-খাতা নিয়ে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মৌখিকভাবে বারণ করা হয়, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শোকজ বা কঠোর কোনো ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়নি।
একজন শিক্ষার্থী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েও যদি প্রাথমিক স্তরের যোগ-বিয়োগ করতে না পারে, তবে তাকে মাধ্যমিক শ্রেণিতে উন্নীত করার দায় কার— তা নিয়ে এখন উঠেছে বড় প্রশ্ন। অভিভাবকদের নোটিশ দিয়েই কি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ? পরপর দুই বছর এমন ভয়াবহ ফল বিপর্যয়ের পরও যদি জবাবদিহিতা না থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও অ্যাকাডেমিক নেতৃত্বের অবহেলার প্রশ্ন এড়ানো যায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও ফলাফলে চরম অবনতি শুরু হয়েছে। তাদের দাবি, প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে তার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তিনি ব্যর্থ এবং পাঠদানে উদাসীন এটা বারবার প্রমাণ হয়েছে। ফলে নতুন করে বলার কিছু নেই।
ওসমানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এই ফলাফলকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারবাইজার ধীরাজ সরকার। তিনি জানান, শ্রেণি পাঠদান ও তদারকি জোরদারে প্রধান শিক্ষকসহ সব শিক্ষকের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়টির তদারকি আরও বাড়ানো হবে।
এদিকে উপজেলা সদরের একটি বিদ্যালয়ের এমন ফলাফলে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ রুবানা তানজিন জানান, বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক ও অপ্রত্যাশিত। বিদ্যালয়ের সমস্যাটি শিক্ষক না শিক্ষার্থীদের— তা চিহ্নিত করতে দ্রুত তদন্ত করে লিখিত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
১১৬ জনের মধ্যে ৭৪ জন ফেল করার পরও দায়িত্বশীলদের উদাসীনতা সচেতন মহলকে ক্ষুব্ধ করেছে। প্রশাসনের তদন্ত পর এই প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার প্রকৃত দায় কার— তা জানার অপেক্ষায় রয়েছে ঘোড়াঘাটের স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা।
সময়ের আলো/জোই