ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসার ইসলাম নীরব। এক সাধারণ কৃষকের সন্তান নীরব দুই বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই এবং সবার বড়। কোনো প্রতিবন্ধকতাই তার স্বপ্নযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসায় একের পর এক বাধা পেরিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন।
বাড়ি থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরের বিদ্যালয়ে যেতেও প্রতিদিন তাকে বাবার সহযোগিতা নিতে হয়েছে। কখনো বাবার কাঁধে, কখনো হুইলচেয়ারে, আবার কখনো বন্ধুদের কাঁধে ভর করে তাকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। ক্লাস শেষে একইভাবে তাকে বাড়ি ফিরতে হতো।
একজন সাধারণ কৃষকের সন্তান নিরবের চোখে এখন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা। সামান্য সাহায্যই হয়ত নীরবের স্বপ্নের পথকে আরও সুগম করে তুলতে পারে।
নিজের সংগ্রাম ও সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ইয়াসার ইসলাম নীরব জানায়, শিশু শ্রেণিতে পড়ার সময় আব্বু আমাকে কোলে করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। পরে স্কুল থেকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আমি হাই স্কুলে ভর্তি হই। আব্বু এবং আমার বন্ধুরা সবসময় আমাকে স্কুলে আনা-নেওয়া করেছে, তাদের অবদান আমি কোনোদিন ভুলব না। আমি সাধারণত শুয়ে পড়াশোনা করতে পছন্দ করতাম। তবে পরীক্ষার আগে আব্বু আমাকে বললেন বসে বসে পড়ার চেষ্টা করতে, কারণ পরীক্ষায় শুয়ে লেখার কোনো সুযোগ নেই। এরপর আমি চেষ্টা করতে থাকি এবং দুই মাসের মধ্যে সফল হই। এখন আমি বসেই লিখতে পারি, তবে শুয়ে লিখলে আমার লেখার গতি অনেক বেশি থাকে। আমি ডান হাতে লিখতে পারি না, বাম হাতে লিখি। আবার হাতের আঙুলগুলোও স্বাভাবিক নয়, মুষ্টিবদ্ধ অবস্থাতেই বাম হাতে লিখে আমি কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ অর্জন করেছি। যদিও আমার গোল্ডেন-এ-প্লাস পাওয়ার আশা ছিল। আমি কখনো কোনো প্রাইভেট পড়িনি। আমার পড়ালেখার যত অর্জন, তার সমস্ত কৃতিত্ব আমার সম্মানিত শিক্ষকদের। আমি তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে তাদের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করব। পরীক্ষার দিন আমার টেবিল ও হুইলচেয়ার নিয়ে সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। আগামীতে এইচএসসি শেষ করে মেডিকেলে পড়ার চেষ্টা করব। আমার ইচ্ছা ছিল একটি ভালো কলেজে পড়ার। আমার এই ফলাফলের কৃতিত্ব এককভাবে কাউকে দেওয়ার সুযোগ নেই, তাই এ সাফল্য আমি সবার জন্য উৎসর্গ করছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই চাওয়া— আমার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য যেন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ.কে.এম সায়ফুল ইসলাম কাজল জানান, নীরবের বাবা, শিক্ষক ও বন্ধুবান্ধব সবাই অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। সবার প্রচেষ্টার ফলেই আজকের এই অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। আমাদের বিদ্যালয় তাকে নিয়ে গর্ব করে। আমরা বিশ্বাস করি, সে ভবিষ্যতে আরও অনেক ভালো করবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শহীদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, নীরবের এ সাফল্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের। তার ভবিষ্যতের পথচলায় কোনো বাধাই যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, সেদিকে আমাদের নজর থাকবে। সে যদি লিখিত আবেদন করে, তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি আমরা ব্যক্তিগতভাবেও তাকে সার্বিক সহযোগিতা করব।
সময়ের আলো/জোই