জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের পল্লী এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।
এ বিষয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট; লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়।
পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৫ কোটি ২০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বিদ্যুৎসেবা দেয়। অর্থাৎ মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব সমিতির আওতায়। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের বরাদ্দ অনুযায়ী গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয়। গত কয়েক দিনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর গড় চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কোথাও কোথাও দৈনিক ৮, ১০ এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
অ্যাসোসিয়েশনের দফতর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জনরোষ বাড়ছে। এরই মধ্যে কিছু বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দায়িত্ব পালনকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসে নিরাপত্তা জোরদারে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আজ সন্ধ্যা থেকে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, গতকাল সন্ধ্যা থেকেই আমরা একটি কৌশল গ্রহণ করেছি। আশা করছি, আজ সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।
মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতি জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা অন্তত একটি এলএনজি কার্গো পাওয়ার আশা করছি। তবে আইএসও ট্যাঙ্কের মাধ্যমে এলএনজি আনতে হলে তা একটি প্রক্রিয়ার বিষয়। আপনারা জানেন, বর্তমানে আইএসও ট্যাঙ্ক সহজলভ্য নয়।
চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার সব ধরনের সম্ভাব্য বিকল্প পথ খতিয়ে দেখছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের হাতে থাকা সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
চলমান সংকট নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের উদ্দেশে কোনো বিশেষ বার্তা রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, জনগণ অবশ্যই সরকারের বার্তা জানতে চায়। আমি যদি সেই বার্তা দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে থাকতাম, তবে অবশ্যই দিতাম।
তিনি আরও বলেন, জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে যে আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো কমতি নেই।
একই সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, রাতারাতি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।
তিনি জানান, এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাও কামনা করেছে। দেশের জ্বালানি খাতের চাহিদা পূরণে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য তিনি পূর্ববর্তী সরকারগুলোকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, আপনি যখন একটি ভুলনীতি গ্রহণ করবেন, তখন কোনো না কোনো সময় তার মাশুল আপনাকে গুনতেই হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আগের সরকারগুলো কোনো মধ্যম বা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খোঁজেনি। তারা শুধু তাৎক্ষণিক সমাধান নিয়ে চলেছে; আর সে কারণেই আজ হঠাৎ এমন সংকট তৈরি হয়েছে।
তার মতে, বর্তমান সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল না এবং এটি যেকোনো সময় দেখা দিতে পারত।
তিনি বলেন, আজ যদি এটি না হতো, তবে হয়তো আগামীকাল হতো। আগামীকাল না হলে হয়তো পরশু। কোনো না কোনো সময়ে আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হতো।
রাত ৮টার মধ্যে মার্কেট-শপিংমল বন্ধ : বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট খোলা ও বন্ধের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- দেশের শপিংমল ও দোকানপাট বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মো. মামুন ভূঁইয়ার সই করা এই সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এর পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই নতুন সময়সীমা ও নিয়ম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বা অনুষ্ঠেয় মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, যা রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।’
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন- হাসপাতাল, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকান এই নিয়মের আওতার বাইরে থাকবে। এর আগে গত ১১ জুনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাত ৯টা পর্যন্ত শপিংমল ও দোকানপাট খোলা রাখার নিয়ম বলবৎ ছিল। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করে নতুন এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নে দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে