বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিনিয়োগ চায় সরকার। আর এই লক্ষ্য পূরণে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বিদ্যমান নীতিগত জটিলতা দূর করা ও ব্যবসা পরিবেশ সহজ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির।
বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য আমদানি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিমালার মতো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের তথ্য তুলে ধরেন। এর জবাবে মন্ত্রী জানান, সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সুগম এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে নিরলসভাবে কাজ করছে।
ইউএস চেম্বার অব কমার্স এবং ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের নেতৃত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে অ্যাপল, কর্টেভা এগ্রিসাইন্স, মেটা, মাস্টারকার্ড, ভিসা ও মেটলাইফসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রতিনিধি প্রিসিলা কোল অভিযোগ করেন, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে দেশে আসা স্মার্টফোন বা ‘গ্রে মার্কেট’ তাদের অফিসিয়াল বিক্রির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এতে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনই অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই সমান্তরাল আমদানি বন্ধে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে অ্যাপল। অন্যদিকে ৪৩ বছর ধরে বাংলাদেশে কর্মরত কৃষি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘কর্টেভা এগ্রিসাইন্স’-এর কান্ট্রি প্রধান অভিষেক দাস জানান, তাদের তৈরি পাঁচটি উন্নত কৃষি পণ্য গত চার বছর ধরে সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে আছে। অনুমোদন প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ ব্যবস্থা চালু এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি হস্তান্তরে একটি যৌথ কারিগরি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
এ ছাড়া বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিরা এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন, বহুতল তৈরি পোশাক কারখানায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা তদারকি বহাল রাখা এবং নতুন শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে অবিলম্বে বিধিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দেন।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের উত্থাপিত অভিযোগ ও পরামর্শের বিষয়ে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেন, ব্যবসা সহজীকরণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সরকার বর্তমানে বিভিন্ন পারমিট ও লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অতিরিক্ত শর্ত ও জটিলতা দূর করতে কাজ করছে।
ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহের জটিলতা পুরোপুরি নিরসনে শিগগিরই একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পোর্টাল চালু করার ঘোষণা দেন মন্ত্রী। এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো অঞ্চলের ব্যবসায়ী ঘরে বসেই অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স আবেদন, ফি প্রদান ও গ্রহণ করতে পারবেন।
মন্ত্রী আরও জানান, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে ব্যাংকিং খাতে বিশেষ সংস্কার শুরু হয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করা সহজ হবে। এ ছাড়া টেকসই ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পাট, চামড়া ও জাহাজভাঙ্গা শিল্পকে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের রফতানি খাতে রূপান্তরের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যা আগামী মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। ইউরেশীয় অঞ্চলের বাজার ধরে রাখতে ইইউর সঙ্গে শিগগিরই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হবে বলেও প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে