গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, প্রবৃদ্ধির হার কত হচ্ছে, শুধু তা দেখলে হবে না, কাঠামো ও গুণগত মান দেখতে হবে। সম্প্রতি দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে গেছে, বেড়েছে বৈষম্য। বাস্তবতা হলো, প্রতি তিনজন শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে একজন বেকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) এসডিজিবিষয়ক সম্মেলনের শেষ দিনের একটি সেশনে মুখ্য আলোচকের বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো ও এসডিজি শীর্ষক এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের (জিআইইউ) যৌথ উদ্যোগে এসডিজিবিষয়ক সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, দেশের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাচ্ছেন না। সে কারণে সরকারের বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। এনআইডি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ।
তিন দিনের এ আয়োজনের শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। উপস্থাপনায় ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। মূলত জন্মনিবন্ধন না থাকায় এনআইডি নিয়ে এমন জটিলতা হয় বলে জানান সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান। এই সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজ কল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১১০তম। হাতে সময় আছে পাঁচ বছরেরও কম। ফলে এখন দ্রুতগতিতে এগোতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকার সবার জন্য বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকার সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চায়।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
মিরপুর মাজার রোড এলাকার বাসিন্দা ও ভ্যানচালক মো. ওয়াসিম বলেন, সেখানে অনেক ছিন্নমূলের এনআইডি নেই। তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর এনআইডি করতে সমস্যা হয় বলে জানান এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রামিসা চৌধুরী। একইভাবে তরুণ সমাজের প্রতিনিধি সোহানুর রহমানের অভিযোগ, বরিশালের মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষ এনআইডি পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে জাতিসংঘ নির্ধারিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের বহু আগেই বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও উন্নয়ন দর্শনে এর মূল রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এসডিজিবিষয়ক সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলেই দেশে এসডিজি-বান্ধব বহু মূল ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার শতভাগ বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু এসডিজির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ হবে না, বরং বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকগুলোর চেয়েও আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এসডিজির মূল উদ্দেশ্য অর্জনে প্রান্তিক পর্যায়ের হস্তশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর জোর দেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি জানান, দেশের তৃণমূলের কারিগরদের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং পণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করার সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এই বিশাল কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এসডিজির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামে শীতলপাটি প্রস্তুতকারী বা কামারদের মতো কারিগরদের শুধু মূলধন দিলে চলবে না, বরং তাদের পণ্যের মান বৃদ্ধি ও বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যেখানে ঢাকার একটি নির্দিষ্ট স্থানে থিয়েটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলোকসজ্জা, মেকআপ শিল্পীসহ সব কারিগরকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হবে।
স্পোর্টস ইকোনমি বা ক্রীড়া অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, খেলাধুলার পেছনে বহুমাত্রিক খাত জড়িয়ে আছে, যার মাধ্যমে নতুন বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব।
থাইল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক মডেলের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেখানে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার মাধ্যমে সাধারণ গ্রামীণ পণ্যের গুণগত মান উন্নত করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা ই-কমার্সের মাধ্যমে রফতানি করা হয়। বাংলাদেশেও প্রান্তিক কারিগরদের এই বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে নীতিগত সহায়তা ও বাজেট বরাদ্দের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে