রাজধানীর ফুটপাথ পথচারীর জন্য। সড়ক যানবাহন চলাচলের জন্য। কিন্তু ঢাকার বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। কোথাও ফুটপাথজুড়ে দোকান, কোথাও ফলের ভ্যান, চায়ের টং, রেস্তোরাঁর বাড়তি অংশ; আবার কোথাও ফুটপাথ দখল করে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী, মোটরসাইকেল কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি। অনেক এলাকায় ফুটপাথের ওপর দোকান বসতে বসতে তা স্থায়ী অবকাঠামোয় রূপ নিয়েছে। ফলে হাঁটার জায়গা না পেয়ে পথচারীকে নামতে হচ্ছে ব্যস্ত সড়কে।
এই দখলদারির বিরুদ্ধে অভিযানও নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালানো হচ্ছে উচ্ছেদ অভিযান। ভাঙা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা, জব্দ করা হচ্ছে মালামাল, করা হচ্ছে জরিমানা, কোথাও কোথাও দেওয়া হচ্ছে কারাদণ্ডও। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই অনেক জায়গায় ফিরে আসছে আগের চিত্র। ফলে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ করা হলেও আবার দখলদাররা বসেন। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠেছে, উচ্ছেদ অভিযানের পরেও কেন কোনো ফল মেলে না।
উচ্ছেদের পরও ফিরে আসে দখল : ফুটপাথের দোকান অনেক মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। একটি স্থায়ী দোকান ভাড়া নেওয়ার মতো পুঁজি অনেকের নেই। ফুটপাথে সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করা যায়, আবার ক্রেতাও পাওয়া যায় সহজে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। ১ থেকে ৫ এপ্রিলের অভিযানে আটটি ট্রাফিক বিভাগে অভিযান চালিয়ে জরিমানা, মামলা ও গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক দিন পরই বিভিন্ন এলাকায় আবার ফুটপাথ দখল হয়ে যাওয়ার চিত্র উঠে আসে।
গত এপ্রিলের অভিযানের সময় ব্যবসা হারানো কয়েকজন হকারও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জরিমানা বা উচ্ছেদের পরও তারা আবার ফুটপাথে ফিরতে বাধ্য হন। হকারদের বক্তব্যও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মিরপুরের একাধিক হকারের ভাষ্য, ফুটপাথই তাদের আয়ের প্রধান জায়গা। বিকল্প কর্মসংস্থান বা ব্যবসার নির্দিষ্ট জায়গা না দিয়ে শুধু উচ্ছেদ করলে তারা আবার আসবেন এটাই স্বাভাবিক।
ইতিমধ্যে নির্ধারিত জায়গার আকার, ব্যবসার ধরন এবং ক্রেতার অবস্থান নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোথাও ৪ ফুট বাই ৫ ফুট জায়গা বরাদ্দের কথা থাকলেও পণ্য সাজানো বা ভ্যান রাখার জন্য এর চেয়ে বেশি জায়গা প্রয়োজন। একদিকে বলা হচ্ছে ফুটপাথ পথচারীর জন্য উন্মুক্ত থাকবে, অন্যদিকে পুনর্বাসনের নামে ফুটপাথের ওপরই যদি হকার বসানোর ব্যবস্থা করা হয়, তা হলে দখল কমার বদলে নতুনভাবে দখল করার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, বিকল্প বাজারের অনুপস্থিতি, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা— সব মিলিয়েই দখলদারির এই চক্র তৈরি হয়েছে। ফুটপাথ দখলের সমস্যার সমাধান সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। অতীতে বহুবার ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা কার্যকর হয়নি। এর সমাধানে দুই সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, ফুটপাথের হকার ও দোকানি, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
ফুটপাথের সুনির্দিষ্ট তালিকা ও ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করতে হবে। কোন ফুটপাথের প্রস্থ কত, কোথায় কতটুকু পথচারী চলাচলের জায়গা থাকবে— তা নির্ধারণ করা জরুরি। প্রকৃত হকারের তালিকা করতে হবে। একই ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ব্যবসা করছেন কি না অন্যের নামে কার্ড নিচ্ছেন কি না— তা যাচাই করতে হবে। ফুটপাথের বাইরে বিকল্প ব্যবসাস্থল তৈরি করতে হবে। শুধু একটি ছোট জায়গা বরাদ্দ করলেই হবে না, সেখানে ক্রেতা, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ও থাকতে হবে।
উচ্ছেদের পর ২৪ ঘণ্টা নয়, দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে ওয়ার্ডভিত্তিক মনিটরিং টিম ও হটলাইন চালু করা যেতে পারে। দখলের নেপথ্যে চাঁদাবাজি বা প্রভাবশালী চক্রের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। কারণ শুধু হকারকে সরিয়ে দিয়ে যদি একই জায়গায় আবার নতুন হকার বসে, তা হলে সমস্যার মূল জায়গায় হাত দেওয়া হবে না। এখন প্রয়োজন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
দখলদারির চেহারা অনেক রকম : ঢাকার ফুটপাথ দখলের সঙ্গে শুধু হকারদের নাম জড়িয়ে দেখলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। অনেক এলাকায় স্থায়ী দোকান বা রেস্তোরাঁ ফুটপাথের ওপর বাড়তি অংশ তৈরি করে ব্যবসা করছে। কোথাও পণ্যসামগ্রী ফুটপাথে রেখে পথ আটকে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও ফুটপাথ হয়ে যাচ্ছে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের পার্কিংয়ের জায়গা।
গত এপ্রিলের অভিযানের আগে ডিএমপি জানিয়েছিল, রেস্তোরাঁ, শোরুম, ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গ্রিল, ওভেন, চেয়ার ও অস্থায়ী কাঠামো বসিয়ে হাঁটার পথ দখল করে রাখছে। এর ফলে পথচারী বাধ্য হয়ে সড়কে নামছেন এবং যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল ‘ফুটপাথের হকার’ বনাম ‘পথচারী’ নয়। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পার্কিং, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবৈধ সম্প্রসারণ, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা এবং বিভিন্ন ধরনের অননুমোদিত স্থাপনা।
হকারদের বিভিন্ন সংগঠন বলছে, রাজধানীজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ হকার রয়েছে। স্থান ও আকার বিবেচনা করে এসব দোকান থেকে ১০০ থেকে ১২০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলমেন্টের ‘দ্য স্টেট অব সিটিজ ২০১৬ : ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা সিটি-গভর্ন্যান্স পারস্পেকটিভ’ শিরোনামের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটির ফুটপাথ থেকে বছরে ১৮২৫ কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়।
হকার সংগঠনগুলোর মতে, বর্তমানে এই অঙ্ক তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। এই চাঁদা তোলার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ছাড়াও থানা-পুলিশের একাংশ জড়িত বলে বরাবরের অভিযোগ। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও দুই সিটি করপোরেশনের বড় অভিযানের পরও কয়েক দিনের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় হকাররা ফিরে আসেন। মিরপুর, বনানী, গুলশান, বাড্ডা, গুলিস্তান, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, সায়েদাবাদ, নিউমার্কেট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশে আবার ফুটপাথ ও সড়কের অংশ দখল করে নেয়।
অর্থাৎ শুধু উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ ফুটপাথ দখলের সঙ্গে জীবিকা, স্থানীয় প্রভাব, চাঁদাবাজি, ক্রেতার চাহিদা, বিকল্প বাজারের অভাব এবং দুর্বল নজরদারি সবকিছু জড়িয়ে আছে।
সিটি করপোরেশনের কর্তারা জানিয়েছেন, ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান চালাতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা গুনতে হয় সংস্থাকে। ঢাকা উত্তর সিটি গত জুন থেকে এ পর্যন্ত ৩৫১টি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে প্রায় ১৬৬ কিমি ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হয়েছে। এতে দুই সিটি করপোরেশনকে অন্তত কোটি টাকা খরচ করতে হয়।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সম্প্রতি পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন ওঠে, মাঠে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশই যখন হামলার শিকার হচ্ছে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা কার্যকর আছে? পুলিশের মনোবলে ঘাটতি থাকলে বাহিনীর মধ্যে উৎসাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের নেওয়া উচিত।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার ফুটপাথ গরিব লোকরা দখল করেন না। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের একটা বড় অংশ। ফুটপাথের ব্যবসা থেকে আসা টাকার বড় একটি অংশ তারা নিয়ে যান। তাদের চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফুটপাথ দখলের সমস্যার সমাধান সম্ভব। শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না। আগে তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে উচ্ছেদের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হবে। এতে প্রতিনিয়ত হাকার ও প্রশাসনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, হকার ব্যবস্থাপনার নীতিমালা থাকতে পারে, কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় ফুটপাথ পথচারীদের চলাচলের জন্যই রাখতে হবে। অর্থাৎ হকার ব্যবস্থাপনা আর ফুটপাথ দখল— দুটিকে এক বিষয় হিসেবে দেখলে সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, প্রশাসন ও হকার নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব রয়েছে, সেখানে থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা শহর ও নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সুশৃঙ্খল হকার ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। ফুটপাথে পথচারী চলাচলের জন্য ন্যূনতম ১.৫ মিটার জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক। হকারদের জীবিকা বন্ধ করতে চায় না ডিএসসিসি। তবে মূল সড়কে কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে