‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরের জেলাগুলো হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্র’

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

চিকিৎসক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক দীর্ঘদিন ধরে গাইবান্ধার উন্নয়ন নিয়ে সরব। গাইবান্ধা জেলা বিএনপির

2026-08-13T18:19:18+00:00
2026-08-13T18:23:18+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬,
২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
বিশেষ সাক্ষাৎকার
‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরের জেলাগুলো হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্র’
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৯ পিএম  আপডেট: ১৩.০৮.২০২৬ ৬:২৩ পিএম
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক। ফাইল ছবি
চিকিৎসক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক দীর্ঘদিন ধরে গাইবান্ধার উন্নয়ন নিয়ে সরব। গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি এবং জেলা পরিষদ গাইবান্ধার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা এই চিকিৎসক ও রাজনীতিক ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন। বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোনোর এই সময়ে তিনি মনে করেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই মহাপরিকল্পনা গাইবান্ধাসহ উত্তরের জেলাগুলোকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। এর পাশাপাশি যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, শিল্পায়ন, ব্রহ্মপুত্রের চরে খনিজ সম্পদ, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, কৃষি অর্থনীতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়েও তার ভাবনা জানতে আমাদের এই বিশেষ আয়োজন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সময়ের আলোর গাইবান্ধা প্রতিনিধি কায়সার রহমান রোমেল

প্রশ্ন : ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে গাইবান্ধাসহ উত্তরের জেলাগুলো হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্র’- এই প্রত্যাশাকে আপনি কতটা বাস্তবসম্মত মনে করেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত একটি নাম। প্রতি বছর বর্ষায় ভাঙন ও শুকনো মৌসুমে পানিশূন্যতার মধ্যে পড়ে তিস্তাপাড়ের মানুষ যুগের পর যুগ ভিটেমাটি হারিয়েছে। দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা এই মহাপরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে দেখে আমি আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছেন। চীনের কারিগরি-আর্থিক সহযোগিতাও নিশ্চিত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

নদীশাসন ও ড্রেজিংয়ে তিস্তার নাব্যতা ফিরলে ভাঙন থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা রক্ষা পাবে, উদ্ধারকৃত জমি কৃষি সম্প্রসারণ, শিল্পাঞ্চল ও সংযোগ সড়কে ব্যবহার করা গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাও কাটবে। নিশ্চিত সেচ পেলে বছরজুড়ে ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে, যা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দেবে। তবে, আমি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি চাই এবং এর সুষ্ঠু ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সোচ্চার থাকব।

প্রশ্ন : গাইবান্ধাকে অনেকে ‘পকেট শহর’ বলেন; যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী দেখছেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : গাইবান্ধা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, ঘাঘট এবং করতোয়ার মতো নদ-নদী দিয়ে বেষ্টিত একটি জেলা। এই নদীগুলোই একসময় এ জনপদ গড়ে তুলেছে, আবার এই নদীগুলোই রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন সরাসরি রেল যোগাযোগ না থাকায় মানুষকে ঘুরপথে যেতে হয়েছে। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগে ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে সরাসরি রেল যোগাযোগ আবার চালু হবে, এটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু শুধু এতটুকুতে চলবে না। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের (এন-৫) পাশাপাশি জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন করা দরকার। উপরন্তু, তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় নদীতীরবর্তী নতুন সংযোগ সড়ক গড়ে উঠলে তা এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা কাটাতেও সহায়ক হবে।

এক্ষেত্রে আমি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলতে চাই। প্রথমত, পলাশবাড়ী-গাইবান্ধা আঞ্চলিক মহাসড়কটি চারলেনে উন্নীত করে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সঙ্গে জেলা শহরের সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সুন্দরগঞ্জ-গাইবান্ধা জেলা মহাসড়কটি প্রশস্ত করে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীত করে জেলা শহরের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, যানজট নিরসনসহ সহজ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে জেলা শহর ঘিরে একটি রিংরোড নির্মাণ করা জরুরি, যা শহরের ভেতরের চাপ কমিয়ে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করবে। চতুর্থত, শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণ যাত্রীছাউনি এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা-ভ্যান স্ট্যান্ড নির্মাণ করাও অত্যন্ত জরুরি, যাতে স্থানীয় যাতায়াত ব্যবস্থাও সুশৃঙ্খল ও যাত্রীবান্ধব হয়।

জেলার ৭ উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের সংযোগ সহজ এবং উন্নত করতে না পারলে এই ‘পকেট শহর’ তকমা ঘুচবে না। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নকে আমি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখি।

প্রশ্ন : সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে যোগাযোগে কতটা সুফল আনবে বলে মনে করেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গাইবান্ধাসহ পুরো রংপুর বিভাগের জন্য বড় স্বস্তির খবর হবে। এখন সান্তাহার-নাটোর-ঈশ্বরদী ঘুরপথে ঢাকায় যেতে হয়, যাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ ঘণ্টা লাগে। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম. মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৮৪-৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে আসবে। ফলে, গাইবান্ধা-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ-যমুনা সেতু করিডোর দিয়ে সংক্ষিপ্ত ও দ্রুততর পথ তৈরি হবে, যা বর্তমান ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সঙ্গে মিলে সার্বিক যোগাযোগকে আরও কার্যকর করে তুলবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও সম্ভাব্য দ্বিতীয় যমুনা সেতুর পাশাপাশি এই রেলপথকেও উত্তরাঞ্চলের সংযোগ-কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা উচিত। আমি এই প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

প্রশ্ন : দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত সেতু হোক, এটি আমিও চাই। উত্তরের এই অংশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি এটি। সেতু হলে জামালপুর-ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে, যা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার বড় সমাধান হতে পারে। সেতু বিভাগ ৩টি অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে- সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ, ফুলছড়ি-দেওয়ানগঞ্জ এবং অন্য কোনো উপযুক্ত করিডোর।

আমার অবস্থান স্পষ্ট- সমীক্ষার ফলাফল রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, স্বচ্ছভাবে বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত, যাতে মানুষ প্রকৃত চিত্র জানতে পারেন। প্রযুক্তিগত কারণে এই সেতু নির্মাণ সম্ভব না হলেও গাইবান্ধার যোগাযোগ চাহিদা উপেক্ষিত থাকতে পারে না। নৌ-যোগাযোগ আধুনিকায়ন, ফেরি সার্ভিস উন্নয়ন ও বিকল্প সড়ক-সংযোগে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রশ্ন : গাইবান্ধা আর কতকাল শিল্পায়নের অপেক্ষায় থাকবে বলে মনে করেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : এটি সত্যিই যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্ন। উত্তরবঙ্গের অন্য অনেক জেলার তুলনায় গাইবান্ধায় বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে, এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত এবং তরুণদের বড় একটি অংশ জীবিকার সন্ধানে ঢাকা বা বিদেশমুখী হচ্ছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি জানি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলে। শিল্পায়নের জন্য শুধু জমি বরাদ্দ যথেষ্ট নয়- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ একসঙ্গে দরকার। গাইবান্ধায় গ্যাস সংযোগ না থাকাসহ নানাবিধ সংকট আমাদের শিল্পায়নের স্বপ্নকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে। আমি মনে করি, কৃষিভিত্তিক ছোট ও মাঝারি শিল্প দিয়েই আমাদের শুরু করা উচিত, যা স্থানীয় কাঁচামাল ও শ্রমশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

প্রশ্ন : গোবিন্দগঞ্জে প্রস্তাবিত ‘রংপুর ইপিজেড’ নিয়ে স্থানীয়ভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আপনার অবস্থান কী?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের জমিতে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়ে গোবিন্দগঞ্জে পক্ষে-বিপক্ষে যে বিতর্ক চলছে, তা আমি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। শিল্পায়ন আমাদের দরকার, কিন্তু তা হতে হবে স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে। যদি এই ইপিজেড বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে স্থানীয় শ্রমশক্তির অগ্রাধিকার, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করেই তা এগোতে হবে। বছরের পর বছর ফাইলবন্দি অবস্থায় না রেখে বিষয়টির একটি স্বচ্ছ সমাধান দরকার।

প্রশ্ন : ব্রহ্মপুত্রের বালুচরে ভারী খনিজ সম্পদের সন্ধান মিলেছে বলে খবর এসেছে। এটিকে দেশের শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন কি?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : হ্যাঁ, এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চরে একাধিক মূল্যবান খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে ভূতাত্ত্বিক জরিপে উঠে এসেছে। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। তবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই সম্পদ আহরণে জাতীয় স্বার্থ সবার আগে রেখে চুক্তি হতে হবে। এছাড়া, আহরণ প্রক্রিয়ায় চরের কৃষিজমি ও নদীর প্রবাহ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে কড়া নজরদারি থাকা জরুরি। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এই খনিজ সম্পদ গাইবান্ধাকে দেশের শিল্প-মানচিত্রে নতুনভাবে জায়গা করে দিতে পারে।

প্রশ্ন : গরু-মহিষ পালনকে চরের মানুষের ‘চলমান ব্যাংক’ বলা হয়। এই খাতকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : চরাঞ্চলের মানুষের কাছে গবাদিপশু শুধু জীবিকা নয়, সঞ্চয়ের একটি জীবন্ত মাধ্যম। প্রয়োজনের সময় তারা এই পশু বিক্রি করে সংকট মোকাবিলা করেন, তাই একে যথার্থই ‘চলমান ব্যাংক’ বলা হয়। এই অর্থনীতিকে আরও টেকসই করতে হলে চরাঞ্চলে পশুখাদ্যের সরবরাহ, নিয়মিত পশুচিকিৎসা সেবা এবং ন্যায্যমূল্যে পশু বিক্রির হাট-বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, পুষ্টি নিরাপত্তার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ঋণ ও বিমা সুবিধা চালু করা গেলে এই খাত আরও বিকশিত হবে।

প্রশ্ন : চরের ফসলকে ঘিরে কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত মনে করেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : গাইবান্ধার চরাঞ্চল ভুট্টা, বাদাম ও নানা রকম সবজি উৎপাদনে সমৃদ্ধ, কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন প্রায়ই। এখানে যদি ছোট পরিসরে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হিমাগার কিংবা কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা যায়, তাহলে ফসলের অপচয় কমবে এবং কৃষকের হাতে বাড়তি মূল্য যোগ হবে। এটিই হতে পারে গাইবান্ধায় কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের ভিত্তি- যা বড় বড় কলকারখানার অপেক্ষায় না থেকে আমাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়েই শুরু করা সম্ভব।

প্রশ্ন : কৃষিতে বিদ্যুৎ সংকট বড় সমস্যা। সৌরশক্তিকে বিকল্প হিসেবে কতটা সম্ভাবনাময় মনে করেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : গাইবান্ধা অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ ব্যবস্থায় যে অসুবিধা তৈরি হয়েছে, তা কৃষকদের জন্য সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তবসম্মত পথ সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প। প্রাথমিক বিনিয়োগ কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কৃষকের খরচ কমায় এবং গ্রিড বিদ্যুতের ওপর চাপ কমায়। গাইবান্ধার মতো কৃষিনির্ভর জেলায় সরকারি ভর্তুকি ও সহজ ঋণের মাধ্যমে সৌর সেচ প্রকল্প ছড়িয়ে দেওয়া গেলে কৃষি উৎপাদনশীলতা অনেকটাই স্থিতিশীল হবে।

প্রশ্ন : গাইবান্ধায় নদীকেন্দ্রিক ও কৃষি পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ চর, বালাসীঘাটের মতো নদীবন্দর এলাকা, সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য- এসব নিয়ে গাইবান্ধার পর্যটন সম্ভাবনা এখনো অব্যবহৃত। নদীবেষ্টিত ৪ উপজেলার নৌপথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে দেশি-বিদেশি পর্যটক টানা সম্ভব। এর জন্য নৌ-ভ্রমণের অবকাঠামো, নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা ও স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটনসেবায় যুক্ত করা প্রয়োজন।

একইসঙ্গে কৃষি পর্যটনেরও বড় সম্ভাবনা আছে। চরাঞ্চলে মৌসুমভেদে ভুট্টা, বাদাম, মরিচ ও শাকসবজির খেত এক অর্থে প্রাকৃতিক ক্যানভাস। শহুরে মানুষকে কৃষিজীবনের সঙ্গে পরিচয় করানো, ফসল তোলার অভিজ্ঞতা কিংবা চরের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি করা গেলে, এটি নতুন আয়ের দুয়ার খুলে দিতে পারে। নদীকেন্দ্রিক ও কৃষি- এই দুই ধারা একসঙ্গে গড়ে তুলতে পারলে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি হবে।

প্রশ্ন : গাইবান্ধায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন এই জেলার শিক্ষাবিস্তারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : এটি গাইবান্ধাবাসীর বহুদিনের ন্যায্য প্রত্যাশা। রংপুর বিভাগের অনেক জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ থাকলেও গাইবান্ধা এখনো বঞ্চিত। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য রংপুর, বগুড়া বা ঢাকায় ছুটতে হয়, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় বাধা। আমি গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবির সঙ্গে একাত্ম। কৃষিনির্ভর এই জেলার অর্থনীতির জন্য এটি সরাসরি উৎপাদনশীলতা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি একটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্যে সুযোগ তৈরি করবে।

একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসক তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়, এর সংযুক্ত হাসপাতাল গোটা জেলার স্বাস্থ্যসেবার মানই বদলে দেয়। এখন জটিল চিকিৎসার জন্য বগুড়া বা রংপুরে ছুটতে হয়, যা চরাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রায় দুঃসাধ্য। পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল হলে জরুরি ও বিশেষায়িত সেবা স্থানীয়ভাবে পাওয়া যাবে এবং জেলার স্বাস্থ্য-অবকাঠামো শক্তিশালী হবে।

প্রশ্ন : গাইবান্ধার উন্নয়ন নিয়ে আপনার বার্তা কী?

ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক : গাইবান্ধা কোনো অবহেলার জনপদ নয়। এখানে নদী আছে, চর আছে, মানুষের পরিশ্রম আছে, মাটির নিচে-উপরে সম্পদও আছে। প্রয়োজন শুধু সততার সঙ্গে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। একজন চিকিৎসক হিসেবে যেমন রোগ নির্ণয়ের পর সঠিক চিকিৎসা দিতে হয়, তেমনি গাইবান্ধার উন্নয়নেও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, তিস্তা মহাপরিকল্পনার সুফল, যোগাযোগ, শিল্পায়ন, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য- এই স্তম্ভগুলোতে ভর করেই গাইবান্ধা একদিন উত্তরবঙ্গের অগ্রগামী জেলা হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   তিস্তা  মহাপরিকল্পনা  বাস্তবায়ন  উত্তরবঙ্গ  অর্থনৈতিক  সমৃদ্ধি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: