বয়স বাড়ে, কর্মজীবন থামে, কমে আসে ব্যস্ততা। যে মানুষটি একসময় পরিবার, কর্মক্ষেত্র আর সমাজের নানা কাজে ছুটে বেড়িয়েছেন, একসময় তাকেই খুঁজতে হয় কথা বলার একজন মানুষ, একটু আড্ডা কিংবা পুরোনো দিনের গল্প শোনার কোনো আপন ঠিকানা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সেই ঠিকানাই নিজেদের জন্য তৈরি করেছেন একদল প্রবীণ। নাম দিয়েছেন ‘বেলা শেষের যাত্রী’।
সন্ধ্যা নামলেই উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চৈতন্য বাজারের একটি ছোট্ট টিনের ঘরে জড়ো হন তারা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে গল্প। কখনো মুড়িমাখা, কখনো চানাচুর-ঝাল। কেউ পত্রিকা পড়েন, কেউ প্রথম যৌবনের স্মৃতি মনে করে গান ধরেন, আবার কেউ নাটকের সংলাপ শুনিয়ে হাসান সবাইকে। চাকরিজীবনের সোনালি দিন, জীবনের পাওয়া-না পাওয়া কিংবা ফেলে আসা মানুষের গল্পও ফিরে আসে সেই আড্ডায়।
‘এসো বন্ধুরা, জীবনের পড়ন্ত বিকালে ফেলে আসা অতীত জীবনের গল্প করি’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১৯ সালে পাঁচজনকে নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। এখন সদস্য ৪০ জনের বেশি।
বিআরডিবির অবসরপ্রাপ্ত উপপরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল ও তার কয়েকজন সমবয়সি বন্ধুর উদ্যোগে শুরু হয় এই পথচলা। কর্মজীবন শেষে তিনি বুঝতে পারেন, অবসরের সঙ্গে শুধু অফিসের ব্যস্ততাই শেষ হয় না, অনেক সময় কমে যায় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও।
সেই শূন্যতা থেকেই নিজেদের বয়সি মানুষদের নিয়ে একটি জায়গা তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। এরপর একে একে যুক্ত হন শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, চিকিৎসক, কৃষি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।
সংগঠনের তরুণতম সদস্যের বয়সও ষাটোর্ধ্ব। অধিকাংশের বয়স ৬৫ থেকে ৭৪ বছরের মধ্যে। এরই মধ্যে পাঁচজন সদস্য মারা গেছেন। তাদের অনুপস্থিতিও এখন এই আড্ডার গল্পের অংশ।
বিনয় কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, এ আয়োজনে একাকিত্ব আর অবহেলা যেন দূরে সরে যায়। বেঁচে থাকার জন্য পাই নবউদ্যম। মনে হয়, আছি তো আমরাও। আনন্দ পাই, মনে বল পাই, ভালো লাগা আসে বুকের ভেতর।
এই আড্ডার গভীরতাটা হয়তো এখানেই। এখানে কেউ কারও কাছে নিজের বয়স লুকান না, বরং বয়সের সঙ্গে জমে থাকা স্মৃতিগুলোই ভাগ করে নেন। যে কথাগুলো ব্যস্ত জীবনে বলা হয়নি, যে গল্পগুলো শোনার মানুষ পাওয়া যায়নি, সেগুলোই সন্ধ্যার পর জায়গা করে নেয় ছোট্ট ঘরটিতে।
কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সংগঠক কঙ্কন সরকার বলেন, প্রবীণ মানেই অবহেলার মানুষ নন। তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা সমাজের বড় সম্পদ। কর্মজীবন শেষ হলেও একজন মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। এই বয়সে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় কথা বলার জায়গা, আপনজনের সঙ্গ এবং নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ।
বেলা শেষের যাত্রী সেই জায়গাটিই তৈরি করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়লে প্রবীণদের একাকিত্ব কমবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সুযোগ পাবে।
তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু বলেন, প্রবীণরা আমাদের সমাজের অভিজ্ঞতার বাতিঘর। তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নতুন প্রজন্মকে অনেক কিছু শেখাতে পারে। বেলা শেষের যাত্রীর মতো উদ্যোগ তাদের একাকিত্ব দূর করার পাশাপাশি পারস্পরিক বন্ধনও শক্তিশালী করছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে।
পাঁচজনকে নিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগটি এখন ৪০ জনের বেশি প্রবীণের মিলনস্থল। তাদের চাওয়া খুব বেশি নয়। দিনের শেষে কয়েকটি পরিচিত মুখ, কিছু গল্প, একটু হাসি আর মন খুলে কথা বলার সুযোগ। জীবনের বেলা হয়তো পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। কিন্তু তাদের আড্ডায় এখনও সন্ধ্যা নামে গল্প নিয়ে, গান নিয়ে, হাসি নিয়ে।
বেলা শেষের যাত্রী তাই শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়, বয়সের শেষ প্রান্তেও মানুষ যে সঙ্গ চায়, ভালোবাসা চায়, বেঁচে থাকার আনন্দটুকু ভাগ করে নিতে চায়, তারই এক জীবন্ত গল্প।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে