কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন– ‘আমাকে সাজা দিন, ইতিহাসই আমাকে মুক্তি দেবে।’ তৎকালীন কিউবার স্বৈরাচারী শাসক নিয়ন্ত্রিত আদালত ভেবেছিল– তরুণ এই আইনজীবীকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েই চিরতরে নিভিয়ে দেওয়া যাবে বিপ্লবের আগুন। কিন্তু ইতিহাস নিজেই যে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি তৎকালীন বিশ্বমোড়লেরা।
কারাগারের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন বিপ্লবীকে নিয়ে শুরু করা সেই লড়াই, শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ। ১৯৫৯ সালে মার্কিন সমর্থিত কিউবান একনায়ক নেতা বাতিস্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে হাভানার রাজপথে সমাজতন্ত্রের পতাকা উড়িয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় ফেলে দেন ফিদেল কাস্ত্রো।
আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরত্বের এক ছোট্ট দ্বীপদেশ কিউবা। কিন্তু সেই ছোট দেশটিই রাতারাতি ওয়াশিংটনের জন্য হয়ে ওঠে বড় এক দুঃস্বপ্ন। পরাশক্তির নীল নকশা, যুগের পর যুগ অর্থনৈতিক অবরোধ আর প্রবল সামরিক চাপ— সবকিছু একহাতে সামলে প্রায় ৫ দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে বীরদর্পে রাজত্ব করেন কাস্ত্রো।
তবে কেবল সামরিক কিংবা রাজনীতির টেবিলেই নয়, বিশ্বমঞ্চে নিজের এক ভিন্ন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিলেন কাস্ত্রো। সোভিয়েত নেতাদের সঙ্গে বরফের দেশে আড্ডা থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বিপ্লবীদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত— সবখানেই ফুটে উঠেছিল তার বর্ণিল ব্যক্তিত্ব। বিশ্বরাজনীতির বড়বড় নামগুলোর মাঝেও নিজের এক অনবদ্য প্রভাব রেখে গেছেন বিপ্লবী এই লৌহমানব।
জাতিসংঘের মঞ্চে ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিটের দীর্ঘতম বক্তৃতার রেকর্ড গড়া এই নেতা শুধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তীব্র মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মাঝে দাঁড়িয়েও নিজ দেশে শতভাগ সাক্ষরতা আর বিশ্বমানের বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
আজ ১৩ আগস্ট, কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকীতে কাস্ত্রোবিহীন কিউবা মুখোমুখি এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটের। নেতৃত্বের চেয়ারে আজ তিনি না থাকলেও, তাঁর সমাজতান্ত্রিক পথ ধরেই এগিয়ে যাওয়ার লড়াই করছে কিউবা।
সমালোচকদের চোখে হয়তো তিনি এক কঠোর শাসক, কিন্তু সমর্থকদের কাছে আজও শোষিত মানুষের আপসহীন এক কণ্ঠস্বর। কাস্ত্রোদের মৃত্যু হয় না, সংগ্রামী নেতারা জনম জনম বেঁচে থাকে কোটি মানুষের মনে। তা বুঝতে পেরেই মৃত্যুর কয়েকমাস আগে কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘নেতারা চিরকাল বাঁচে না, কিন্তু আদর্শ বেঁচে থাকে চিরকাল।’
সময়ের আলো/জেডি