পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ যেন পরিণত হয়েছে ‘কনটেইনারাবাদে’। বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রস্তাবিত মিছিল ঠেকাতে প্রায় চার সপ্তাহ ধরে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সারি সারি কনটেইনার বসিয়ে রেখেছে সরকার। এতে শুধু রাজধানীর চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষতির মুখে পড়েছেন শত শত ট্রাক মালিক, চালক ও পরিবহন ব্যবসায়ী।
পরিবহন সংগঠন ও সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাবে, ইসলামাবাদের সড়ক অবরোধে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ভারী কনটেইনার ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর অনেকগুলোই ব্যক্তিমালিকানাধীন ট্রাক ও কনটেইনার। আবার কিছু কনটেইনার বিদেশি শিপিং কোম্পানির মালিকানাধীন।
পিটিআইয়ের মিছিলটি প্রথমে ২৭ সেপ্টেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়ার পেশোয়ার থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। পরে ‘কৌশলগত কারণে’ কর্মসূচি পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়। দলটির দাবি, কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে মুক্ত করার দাবিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই কর্মসূচি।
সরকার অবশ্য কনটেইনার ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর ভাষ্য, রাজনৈতিক কর্মসূচির তারিখ নয়, গোয়েন্দা তথ্য ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করেই রাজধানীতে আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কনটেইনারেই কোটি টাকার খরচ
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পিটিআইয়ের মিছিল ঘিরে এক সপ্তাহের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য শুরুতে প্রায় ৮২ কোটি পাকিস্তানি রুপি চেয়েছিল ইসলামাবাদ পুলিশ। কর্মসূচি এক সপ্তাহ পিছিয়ে যাওয়ায় মোট ব্যয় ১০০ কোটি রুপি ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর বড় একটি অংশ যাচ্ছে কনটেইনার ভাড়ায়। একটি হিসাবে, ১ হাজার ৫০০-এর বেশি কনটেইনারের দৈনিক ভাড়া প্রায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ রুপি।
তবে কনটেইনার মালিকদের দাবি, তারা এখনো কোনো অর্থ পাননি। অল পাকিস্তান গুডস ট্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মুহাম্মদ ওবায়েস চৌধুরী বলেন, একটি ট্রাক ও কনটেইনার আটকে থাকলে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার রুপি পর্যন্ত আয় হারাতে হয়। অতীতের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আটকে পড়া যানবাহনের জন্যও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
সরকার অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করেছে। তালাল চৌধুরীর ভাষ্য, কনটেইনার বাজারদর অনুযায়ী চুক্তির মাধ্যমে ভাড়া নেওয়া হয় এবং সরকারি হিসাবের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়।
পুলিশের হেফাজতে ট্রাক, অপেক্ষায় চালক
নওশেরার ট্রাক মালিক হাজি আটলাস খানের চারটি ট্রাকও আটকে আছে। তার দাবি, সেপ্টেম্বরের শুরুতে একটি ট্রাক ইসলামাবাদে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ সেটি জব্দ করে। পরবর্তী কয়েক দিনে আরও তিনটি ট্রাক আটক করা হয়।
ট্রাকচালকদের অনেকেই এখন গাড়ির পাশে বসে দিন কাটাচ্ছেন। মালিকেরা যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ায় চালকদেরও সেগুলোর কাছাকাছি থাকতে বলা হয়েছে।
চালক মোহাম্মদ নাসির জানান, ইসলামাবাদ ছাড়ার সময় পুলিশ তার ট্রাক থামিয়ে দেয়। তার কনটেইনারটি একটি বিদেশি শিপিং কোম্পানির। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেইনার ফেরত দিতে না পারলে বড় ধরনের জরিমানার মুখে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
আরেক চালক মোহাম্মদ সেলিম জাফর বলেন, কখন তাদের ট্রাক ছেড়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত করে কিছু জানাচ্ছে না। দীর্ঘ অপেক্ষায় চালকদের খাবার, গোসল ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধা নিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
ক্ষতি শুধু পরিবহন খাতে নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, কনটেইনার আটকে রাখার অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু ভাড়া বা পরিবহন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর ব্যবসা, হোটেল, পর্যটন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমও এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের উপনির্বাহী পরিচালক সাজিদ আমিন জাভেদ বলেন, কোনো হোটেল বন্ধ হয়ে গেলে শুধু কক্ষ ভাড়ার আয়ই হারায় না; এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের কাছেও নেতিবাচক সংকেত যায়।
ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডি মিলে পাকিস্তানের অন্যতম বড় মহানগর অঞ্চল। নগরবিষয়ক গবেষক ড্যানিয়াল আদম খানের মতে, রাজধানীর যোগাযোগ ও ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হলে এর প্রভাব দেশের অন্য অঞ্চলগুলোর সঙ্গেও ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে কনটেইনারগুলো এখন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠেকানোর ব্যারিকেড নয়, রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ হয়ে উঠেছে। তরুণ পার্কুর ও ক্যালিসথেনিকস খেলোয়াড় মুজাদ্দাদ আসরার সেসব কনটেইনারের ওপর কসরতের ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, প্রতিবছরই কোনো না কোনো সময় ইসলামাবাদে কনটেইনার আসে—এ কারণেই অনেকে মজা করে রাজধানীটিকে এখন ‘কনটেইনারাবাদ’ বলে ডাকছেন।
তবে কনটেইনারের ওপর কসরত করা তরুণদের কাছে এটি নিছক বিনোদন হলেও, সেগুলোর পাশে দিনের পর দিন অপেক্ষা করা ট্রাকচালকদের কাছে এটি জীবিকা ও অনিশ্চয়তার গল্প।
সময়ের আলো/জেডি