ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়েছিলেন দুই ভাই সাঈদ হাসান ও মোহাম্মদ এবং তাদের পরিবার। রকেট হামলা, গোলাগুলি, খাবার-পানির সংকট ও গাড়ির যান্ত্রিক বিপর্যয় পেরিয়ে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত পৌঁছান দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মুকাল্লায়।
৫৮ বছর বয়সি সাঈদ ও তার ৪৭ বছর বয়সি ভাই মোহাম্মদের বাড়ি ছিল লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর আল-খোখায়। গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম এলাকা ছেড়ে যেতে দেখে তারা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর মধ্যেই কাছের একটি বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েকজন আহত হন। হামলার পর পরিবার নিয়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন দুই ভাই।
তারা সঙ্গে নিতে পেরেছিলেন সামান্য কাপড়চোপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু হালকা জিনিসপত্র। মোহাম্মদ পোশাকের ব্যবসা করতেন। বাড়িতে থাকা বিপুল পরিমাণ পণ্যও সঙ্গে নিতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন, পাশের মোচা শহরে রাত কাটিয়ে পরদিন ফিরে এসে বাকি জিনিসপত্র নিয়ে যাবেন। কিন্তু হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় সেই সুযোগ আর হয়নি।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে দুটি গাড়িতে করে পরিবারগুলো রওনা দেয়। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা জানতে পারেন, তাদের টিন ও ত্রিপলের তৈরি ঘরগুলোও স্থানীয়রা খুলে নিয়ে গেছে এবং ঘরে থাকা জিনিসপত্র লুট হয়েছে।
পথে তারা দেখতে পান, সরকারি বাহিনীর সেনারা অস্ত্র ফেলে পালাচ্ছেন। কোথাও পড়ে ছিল অস্ত্র ও গোলাবারুদ, কোথাও হামলায় নিহত সেনাদের মরদেহ। গোলাগুলি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এড়িয়ে এগোতে হয় তাদের।
পানির সংকটও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দোকানপাট বন্ধ থাকায় কোথাও পানি পাওয়া যাচ্ছিল না। এর মধ্যে মোহাম্মদের গাড়ির টায়ার বিস্ফোরিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত টায়ার বদলে কোনোমতে আবার যাত্রা শুরু করেন তিনি। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিতে একপর্যায়ে তিনি টায়ার হাতে নিয়ে মেরামতের দোকান খুঁজতে বের হন। রাস্তায় আতঙ্কিত চালকেরা থামতে চাইছিলেন না।
১০ সেপ্টেম্বর সাঈদ ও তার পরিবার এডেনে পৌঁছান। সেখানে বাস্তুচ্যুতদের জন্য একটি স্কুলে আশ্রয় পান তারা। একটি কক্ষে গাদাগাদি করে ছিল আটটি পরিবার। মোহাম্মদও সেদিন রাতে এডেনের উপকণ্ঠে পৌঁছান। সেখানে এক সেনা তাদের পানি দেন।
দুই ভাইয়ের পরিবার শেষ পর্যন্ত ১৬ সেপ্টেম্বর মুকাল্লার পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছায়। অর্থাৎ বাড়ি ছাড়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর শেষ গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয় তারা। পথে তাদের গাড়ি প্রায় ৩০০ কিলোমিটার চললেও একবারও জ্বালানি নেওয়ার সুযোগ হয়নি। পরে জ্বালানি সংগ্রহ করতে আরও দুই দিন অপেক্ষা করতে হয়।
মুকাল্লায় দুই পরিবার মিলে তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। মাসিক ভাড়া ৪০০ সৌদি রিয়াল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর দুই সপ্তাহ পরও দুই ভাই কোনো কাজ পাননি। সঞ্চয় দিয়ে দিন কাটলেও সেই অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
মোহাম্মদ বলেন, তাদের কেউ সহায়তা করেনি। অর্থ বাঁচাতে তারা অনেক সময় খাবারও বাদ দিচ্ছেন। যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
ইয়েমেন সরকারের বাস্তুচ্যুত শিবির ব্যবস্থাপনা ইউনিটের সর্বশেষ হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে দেশটিতে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯০৬ মানুষ বা ২৯ হাজার ৫১৯ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ। বাস্তুচ্যুতদের বড় অংশই তাইজ গভর্নরেটের বাসিন্দা।
মুকাল্লায় সরকারি ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ আওয়াদ বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষজন প্রায় খালি হাতে সেখানে পৌঁছেছেন। তাদের মধ্যে শিশু-বৃদ্ধের পাশাপাশি অসুস্থ, গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নারীরাও রয়েছেন। তাদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে একটি আশ্রয়শিবির তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে মোহাম্মদের স্ত্রী ফাতিমার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা খাবার বা বাসস্থান নয়। পোশাক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া ১ কোটি ২০ লাখ ইয়েমেনি রিয়াল ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, সেটিই এখন তার প্রধান উদ্বেগ। যুদ্ধের কারণে ঘর হারানোর পরও সেই ঋণের বোঝা সঙ্গে করেই নতুন জীবনের অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি