দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট চরমে পৌঁছানোয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার-কারখানা পরিচালনা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে মাত্র ২৯ শতাংশ এবং সার-কারখানাগুলোতে মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে একদিকে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত জরুরি ইউরিয়া সার উৎপাদনে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে পেট্রোবাংলার ভর্তুকি বিল প্রায় তিনগুণ বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়তি ব্যয়ের জোগান দিতে গিয়ে অর্থ ও জ্বালানি বিভাগ চরম হিমশিম খাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা : তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর।
সিপিডির প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২০০ থেকে ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি করতে না পারায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাস না পাওয়ায় দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একইভাবে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা আগামী কৃষি মৌসুমে সার সংকট ও আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
জ্বালানি খাতের এই অচল অবস্থার পেছনে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বড় প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতার থেকে চুক্তির নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই ঘাটতি মেটাতে পেট্রোবাংলা খোলা বাজার বা ‘স্পট মার্কেট’ থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। যেখানে আগে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার, তা এখন লাফিয়ে ১৫.৮৮ থেকে ১৬.৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বাজেটের হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে সরকারের বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তা বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আলোচনায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি একটি মৌলিক উপাদান, যা ছাড়া পুরো অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। শিল্পকারখানা, অফিস-আদালত কিংবা গেরস্থালি কোনো কিছুই জ্বালানি ছাড়া স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বহুমাত্রিক অভিঘাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আগে যেখানে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতো, সেখানে এখন তাৎক্ষণিকভাবে সংকট সামাল দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া, বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য রয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সেসব অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
প্রতিবেদনে এলপিজি খাতের সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভরতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট এবং নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার মূল ভরসা হয়ে উঠেছে এলপিজি। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮.৭ শতাংশই মেটাতে হচ্ছে বেসরকারি আমদানির মাধ্যমে, যেখানে সরকারি খাতের অবদান নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশের নিচে। বিশ্ববাজারের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
আলোচনাসভায় অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) সভাপতি ডেভিড হাসনাতসহ সংশ্লিষ্ট খাতের অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা