ব্রাজিলের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি সেরাডো। একসময় যেখানে নির্বিঘ্নে বিচরণ করত জায়ান্ট অ্যান্টইটার স্তন্যপায়ী প্রাণী। যারা বেঁচে থাকত পিঁপড়া ও উইপোকা খেয়ে। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ, বনভূমি উজাড় ও সড়ক নির্মাণের কারণে সেই আবাসস্থল এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আর মানুষের তৈরি এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়ংকর মূল্য দিতে হচ্ছে প্রাণীগুলোকে।
জায়ান্ট অ্যান্টইটারদের মধ্যে জেন নামে একটি প্রাণীর গল্প যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। পশ্চিম ব্রাজিলের একটি খামারে জন্ম নেওয়া জেন ছোটবেলা থেকেই একের পর এক বিপদের মুখোমুখি হয়েছে। তার এক ভাই সম্ভবত পুমার আক্রমণে মারা যায়, আর আরেক ভাই গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারায়। মাত্র এক বছর বয়সে জেনের মাও কাছের একটি মহাসড়ক পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কায় মারা যায়। পরের বছর খামারের ইউক্যালিপটাস গাছ কেটে ফেলা হলে জেন হারায় তার শেষ আশ্রয়টুকুও।
এখন প্রায় একটি গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুরের সমান আকারের জেনকে টিকে থাকতে হচ্ছে মানুষের তৈরি এক বদলে যাওয়া পরিবেশে। দিনের বেলায় পিঁপড়ার ঢিবি ও উইপোকার বাসা খুঁজে বেড়ায় সে। প্রায় দুই ফুট লম্বা আঠালো জিহ্বা দিয়ে এক দিনে হাজার হাজার পোকা খেতে পারে এই প্রাণী। কিন্তু খাবারের সন্ধানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচল করতে গিয়ে তাদের প্রায়ই মহাসড়ক পার হতে হয়। সেখানেই ওত পেতে থাকে প্রাণঘাতী বিপদ।
কৃষি সম্প্রসারণে বদলে যাচ্ছে আবাসস্থল : বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সড়ক নেটওয়ার্ক রয়েছে ব্রাজিলে। দেশটির সেরাডো অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মহাসড়ক ও ভারী যান চলাচল। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সেরাডোর প্রায় ১২ হাজার ৮০০ বর্গমাইল প্রাকৃতিক আবাসস্থল সয়া, ভুট্টা, ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ফসলের জমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রাণীগুলোর বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের চলাচলের পথও কেটে গেছে অসংখ্য সড়ক।
জায়ান্ট অ্যান্টইটারদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ধীরগতির চলাফেরা, গাঢ় রঙের শরীর এবং রাতে সক্রিয় থাকার অভ্যাস তাদের গাড়ির ধাক্কার ঝুঁকিতে ফেলে। জীববিজ্ঞানী আরনাউদ দেসবিয়েজের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলে জায়ান্ট অ্যান্টইটারদের অস্তিত্বের জন্য সড়ক দুর্ঘটনাই এখন সবচেয়ে বড় হুমকি।
তিন বছরে ১২ হাজারের বেশি প্রাণীর মৃত্যু
২০১৭ সালে দেসবিয়েজ জায়ান্ট অ্যান্টইটার সংরক্ষণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক গবেষণা শুরু করেন। তিন বছর ধরে তার দল ব্রাজিলের চারটি সড়কে ৫০ হাজার মাইলেরও বেশি পথ ঘুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া প্রাণীদের হিসাব সংগ্রহ করে। তাদের তালিকায় উঠে আসে ১২ হাজারের বেশি মৃত প্রাণী। এর মধ্যে ছিল ৭৬৬টি জায়ান্ট অ্যান্টইটার।
তবে বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, মৃত অ্যান্টইটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দেহ শিকারি বা মৃতভোজী প্রাণী সরিয়ে নেয়। আবার গাড়ির ধাক্কায় আহত অনেক অ্যান্টইটার রাস্তার পাশ থেকে দূরে সরে গিয়ে মারা যায়। ফলে জরিপকারীদের চোখে পড়ে না তাদের দেহ।
এই প্রাণহানি শুধু বন্যপ্রাণীর জন্যই বিপজ্জনক নয়, মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি পূর্ণবয়স্ক জায়ান্ট অ্যান্টইটারের ওজন ১০০ পাউন্ডেরও বেশি হতে পারে। ফলে গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে চালক ও যাত্রীরাও গুরুতর আহত হতে পারেন, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
সমাধান হতে পারে ‘বন্যপ্রাণী করিডোর’
তবে গবেষকদের কাজ শুধু সমস্যার হিসাব করেই থেমে নেই। জিপিএস ট্র্যাকিং যন্ত্র লাগিয়ে জায়ান্ট অ্যান্টইটারদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করেন। কিছু প্রাণী সড়কের নিচ দিয়ে নিরাপদে চলাচলের জন্য প্রাকৃতিক জলধারা, সেতু কিংবা গবাদিপশু পারাপারের পথ ব্যবহার করছে।
এ থেকেই গবেষকদের ধারণা হয়, সড়কের দুই পাশে বেড়া নির্মাণ করে প্রাণীগুলোকে নির্দিষ্ট প্রবেশপথে নিয়ে যাওয়া গেলে এবং মহাসড়কের নিচে পর্যাপ্ত আন্ডারপাস তৈরি করা গেলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ব্রাজিলের কিছু এলাকায় এরই মধ্যে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির ফেডারেল কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় প্রায় ১০০ মাইল বেড়া এবং ১০টি নতুন বন্যপ্রাণী পারাপারের পথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।
‘হাইওয়ে অব ডেথ’ বদলে যাচ্ছে
ব্রাজিলের ইজ-২৬২ মহাসড়ক একসময় এতবেশি প্রাণী হত্যার জন্য পরিচিত ছিল যে এর নাম হয়ে যায় ‘হাইওয়ে অব ডেথ’ মৃত্যুর মহাসড়ক। এই সড়কটি সেরাডো ও বিশ্বের বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমি প্যান্টানাল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে।
২০২৫ সালে ব্রাজিলের পরিবহন অবকাঠামো বিভাগ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই মহাসড়ককে বন্যপ্রাণীবান্ধব করতে বড় ধরনের সংস্কার শুরু করে। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় ১০০ মাইলের বেশি বেড়া, ১০টি নতুন আন্ডারপাস এবং বিদ্যমান সেতু ও কালভার্টের পরিবর্তন। এমনকি গাছের ওপর দিয়ে চলাচলকারী বানরসহ অন্যান্য প্রাণীর জন্য সাতটি নতুন ‘রোপ ব্রিজ’ নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
লড়াইটা শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানোর নয়
তবে শুধু আন্ডারপাস, সেতু ও বেড়া নির্মাণ করলেই জায়ান্ট অ্যান্টইটারদের সব বিপদ কাটবে না। কৃষির জন্য সেরাডোর ক্রমাগত রূপান্তর, বনভূমিতে আগুন এবং কুকুরের আক্রমণ- সবই তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে আছে। তার ওপর এদের প্রজনন হারও তুলনামূলক কম। একটি মা অ্যান্টইটার সাধারণত একবারে একটি শাবকের জন্ম দেয় এবং প্রায় ছয় মাস তাকে লালন করে।
তারপরও আশার গল্প আছে। গাড়ির ধাক্কায় মা হারানো একটি শাবককে উদ্ধার করে চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর জেন যে প্রাণীটি মায়ের মৃত্যুর পরও কোনোভাবে টিকে আছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে রাতের অন্ধকারে সেই মহাসড়কই পার হয়ে যায়, যে সড়ক তার মায়ের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল; এরপর সে নতুন আবাসের সন্ধানে প্রায় ২০ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে।
জায়ান্ট অ্যান্টইটারদের গল্প তাই শুধু একটি বিপন্ন বন্যপ্রাণীকে রক্ষার গল্প নয়। এটি মানুষের উন্নয়ন আর প্রকৃতির অস্তিত্বের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার গল্প। গবেষকদের ভাষায়, লক্ষ্য শুধু অ্যান্টইটারকে বাঁচানো নয়; বরং সড়ককে এমনভাবে তৈরি করা যাতে মানুষ, বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্য সবাই নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও