সোনালী আঁশের ঐতিহ্যবাহী জেলা নড়াইলে চলতি মৌসুমে পাটের আশানুরূপ ফলন হয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি ও হাজারো কৃষকের জীবিকার অন্যতম প্রধান নির্ভরতা এই পাট। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং সময়মতো বৃষ্টিপাতের কারণে মাঠজুড়ে এবার ফলন হয়েছে বেশ সন্তোষজনক। তবে বাম্পার ফলনের মধ্যেও কৃষকদের কপালে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ভাঁজ বাজারে ঘামের ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়।
নড়াইলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধুই পাটচাষিদের ব্যস্ততা। কোথায়ও চলছে পাট কাটা, কোথায়ও আঁটি বেঁধে জলাশয়ে জাগ দেওয়ার প্রস্তুতি, আবার কোথায়ও দেখা মিলছে আঁশ ছাড়ানোর ধুম। মৌসুমের শুরুতে কিছুটা বৃষ্টির ঘাটতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি সঙ্গ দেওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু হাসির বদলে কৃষকদের মাঝে কাজ করছে অজানা ভয়, কারণ গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে প্রায় দ্বিগুণ।
স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সার, ডিজেল, সেচ এবং কৃষি শ্রমিকের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে পাটের উৎপাদন ব্যয় মেটাতে গিয়ে তারা দিশেহারা। নড়াইলের কয়েকজন পাটচাষি জানান, প্রতি মণ পাটের দাম অন্তত ৩,০০০ থেকে ৩,২০০ টাকা না পেলে আমাদের মূল উৎপাদন খরচই উঠবে না। পরিশ্রমের মূল্য পাওয়া তো দূরের কথা, লোকসান গুণতে হবে। এর পাশাপাশি সরকার যদি সারের দাম কিছুটা কমিয়ে দেয়, তবেই কৃষকরা বেঁচে থাকতে পারবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নড়াইলে ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। পাটের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জেলার ৩ হাজার ২০০ জন কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সারসহ সরকারি কৃষি প্রণোদনা প্রদান করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, নড়াইলের উপপরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, কৃষকদের সময়মতো পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই জেলার বেশিরভাগ মাঠের পাট কাটা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হবে এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে কৃষকরা ভালোমানের আঁশ ঘরে তুলতে পারবেন।
ভালো ফলনের স্বস্তি থাকলেও নড়াইলের হাজার হাজার পাটচাষির দৃষ্টি এখন শুধুই জেলা ও আঞ্চলিক বাজারগুলোর দর-দামের দিকে। পাটচাষি ও স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাটের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত সরকারি তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কাঙ্ক্ষিত দাম নিশ্চিত করা গেলে সোনালী আঁশের হারানো ঐতিহ্য যেমন পুনরায় সমৃদ্ধ হবে, তেমনি হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটা কৃষকের মুখেও ফুটবে তৃপ্তির হাসি।
সময়ের আলো/আতা