হামে পাঁচ মাসে ৯০০ মৃত্যু

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিল আট মাস বয়সি ইরফান আহমেদ। হামে আক্রান্ত শিশুটিকে প্রথমে ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসা দেওয়া

2026-08-16T02:14:30+00:00
2026-08-16T02:14:30+00:00
 
  রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬,
১ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
হামে পাঁচ মাসে ৯০০ মৃত্যু
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিল আট মাস বয়সি ইরফান আহমেদ। হামে আক্রান্ত শিশুটিকে প্রথমে ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় তার। 

ইরফানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা আবারও প্রশ্ন তুলেছে দেশের টিকাদান ও শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো মৃতদের বড় অংশ শিশু এবং তাদের একটি বড় অংশ এমন বয়সি, যখন নিয়মিত টিকা পাওয়ার সুযোগই হয়নি। তাই এখন শুধু নতুন রোগী কতজন হচ্ছে সেই হিসাবের দিকে তাকালে চলবে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সবশেষ হিসাব বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে পাঁচ মাসে হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৯০২ জন। এর মধ্যে হামের উপসর্গে মৃত্যু ৮০৩ জনের এবং পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে হাম বা হামের উপসর্গে। শনিবার নতুন করে মারা গেছে আরও আটজন। মৃত্যুর এই সংখ্যা শুধু একটি রোগের বিস্তারের চিত্র নয়; বরং সংক্রমণ শনাক্ত, চিকিৎসা, টিকাদান এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে তারও ইঙ্গিত দেয়।

আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়েছে : স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে, পাঁচ মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৭৬ জন। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭ হাজার ৮০০ জনের। অর্থাৎ সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত দুই শ্রেণি মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫৭৬ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭০০ জন, একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৫৪৯ জন।


সংক্রমণের চাপ বোঝা যায় হাসপাতালগুলোর ওপরও। প্রতিদিন শত শত রোগী ভর্তি হচ্ছে। ফলে শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, চিকিৎসা অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হাম নিজেই যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি জটিলতা তৈরি হলে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।

বড় ঝুঁকিতে টিকার বয়সের আগের শিশুরা : প্রাদুর্ভাব শুরুর পর হাম দ্রুত দেশের ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির পর সংক্রমণ কমলেও তা প্রাদুর্ভাব-পূর্ব পর্যায়ে পুরোপুরি ফেরেনি। হামের মৃত্যুর পরিসংখ্যানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো মৃতদের বয়স। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামে মারা যাওয়া মানুষের ৫১ শতাংশের বয়স নয় মাসের কম। এর মধ্যে ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম এবং ৩১ শতাংশের বয়স ছয় থেকে নয় মাস। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিশুরই নিয়মিত হামের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি।

বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। কিন্তু বর্তমান প্রাদুর্ভাবের তথ্য দেখাচ্ছে, টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমিত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এখানেই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার বড় চ্যালেঞ্জটি তৈরি হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মূলত নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। কিন্তু সংক্রমণের বিস্তার যখন কম বয়সি শিশুদেরও ব্যাপকভাবে আক্রান্ত করে, তখন শুধু নিয়মিত টিকাদান দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, হামে মৃতদের ৯০ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি। ৭ দশমিক ৯ শতাংশ এক ডোজ এবং ২ দশমিক ১৯ শতাংশ দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও মারা গেছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম।

এই প্রশ্নটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব মৃত্যু যে টিকা না নেওয়ার কারণে হচ্ছে তা সরলভাবে বলা যায় না। কিছু শিশু টিকার এক বা দুই ডোজ নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। তবে তাদের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির সময় শিশুদের টিকা দেওয়ার বয়স সাময়িকভাবে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছিল। তারপরও ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে।

এ কারণে শিশুদের শরীরে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে, তা নতুন করে বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কোন বয়সে টিকা শুরু করলে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া যাবে, সেটিও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা জরুরি।


হাম প্রতিরোধে টিকা সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলেও বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, কেবল টিকাদান কর্মসূচির পরিসর বাড়ালেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, জটিল রোগীদের দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো এবং হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সংক্রমণ কমলেও স্বস্তির সুযোগ নেই : আগের কয়েক মাসের হিসাবের সঙ্গে বর্তমান পরিসংখ্যান তুলনা করলে দেখা যায়, একসময় প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়ছিল। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহেও এক দিনে শত শত সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত এবং একাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সংক্রমণের গতি কমার লক্ষণ থাকলেও রোগটি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পাঁচ মাসে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি আক্রান্ত এবং ৯০০-এর বেশি মৃত্যু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   হাম  মৃত্যু  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: