ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও পশ্চিমা ন্যাটো জোটকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে নতুন এক ছক কষছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর এ কৌশলের মধ্যমণি করা হয়েছে মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যার ছোট্ট দেশ মলদোভাকে। দেশটির নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, ভোট কেনা, অর্থোডক্স যাজকদের ব্যবহার এবং তরুণদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরো মলদোভাকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে ক্রেমলিন। কয়েক মাসের অনুসন্ধান শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রেমলিনের এ অভিযানে হ্যাকিং ও অপপ্রচারের মতো পশ্চিমা দেশগুলোয় ব্যাপক পরিচিত পদ্ধতিও ছিল। তবে মলদোভায় রুশ হস্তক্ষেপ ইউক্রেন ছাড়া বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। তিন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমকে অস্থিতিশীল করতে এটি পুতিনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত ও দুঃসাহসী পরিকল্পনাগুলোর একটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিয়ার এক প্রত্যন্ত এলাকার রিসোর্ট কমপ্লেক্সে গড়ে তোলা একটি প্রশিক্ষণ শিবির থেকে এ অভিযানের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। বাইরে থেকে এটি দেখতে ছিল অনেকটাই একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পের মতো।
ছিল বারবিকিউ ও সৈকতে ভলিবল খেলার আয়োজন। ওয়েলনেস স্পার নাম রাখা হয়েছিল ‘রিলাক্স অ্যান্ড হ্যাভ ফান’।
কিন্তু এ প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষরা আসলে সহিংস কিছু কাজে যুক্ত ছিলেন। যেমন পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙা এবং ভবনে আগুন লাগানোর কৌশল শেখা। তারা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। পরে জানা যায়, এ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনি হস্তক্ষেপে দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কমান্ডো বাহিনী গড়ে তোলা।
সার্বিয়ার ক্যাম্প ছাড়াও বসনিয়া ও মস্কোতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়েছে রুশ এজেন্টরা। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল রুশপন্থি মলদোভানদের পদাতিক সৈনিকে পরিণত করা। মলদোভার শত শত অর্থোডক্স যাজককে ভোটার সংগ্রহ ও গির্জা থেকে রুশ বয়ান ছড়ানোর জন্য অর্থ দিয়েছে মস্কো।
এ ছাড়া নির্বাসিত এক মলদোভান বিলিয়নিয়ারের অর্থায়নে মস্কোর কাছে ক্রেমলিনের নকল সিলিকন ভ্যালি ‘স্কোলকোভো’ থেকে সাজানো একটি জটিল ভোট কেনার প্রকল্পে কয়েকশ কোটি ডলার ব্যয় করেছে ক্রেমলিন। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মস্কোর এ অভিযান এখনও থামেনি। চলতি বসন্তে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র মলদোভার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করেছে, জলপথ দূষিত করেছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত করেছে।
এই রুশ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কর্মী, মলদোভার জ্যেষ্ঠ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং অর্ধ ডজনেরও বেশি ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। মলদোভার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা সংক্রান্ত হাজার হাজার নথিও পর্যালোচনা করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। স্পর্শকাতর নিরাপত্তা অভিযানের বিষয়ে আলোচনা বা প্রতিহিংসার আশঙ্কায় সাক্ষাৎকার দেওয়া অনেকেই নাম গোপন রাখতে চেয়েছেন।
মলদোভায় রুশ কর্মকাণ্ডের বিবরণ আদালতের মামলা ও স্থানীয় প্রতিবেদনে এরই মধ্যে এসেছে। তবে ভোট কেনার প্রকল্প এবং রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকাসহ এই অভিযানের প্রকৃত পরিধি ও বিস্তৃতি এর আগে প্রকাশ পায়নি।
যদিও রুশ কর্মকর্তারা মলদোভার বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মস্কো পশ্চিমকে দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ওঠা অভিযোগও তারা উড়িয়ে দিয়েছেন। গত ডিসেম্বরে সামরিক কমান্ডারদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পুতিন রাশিয়ার হুমকি নিয়ে ‘হিস্টিরিয়া উসকে দেওয়ার’ জন্য ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনা করেছিলেন। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুটি দেশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কিছু দিন পরই ঠিক এর বিপরীত বার্তা দিতে গোপন এক ব্রিফিংয়ে নেতাদের একত্র করেন পুতিন। কর্মকর্তারা জানান, পুতিন তাদের জানিয়েছিলেন যে ২০২৬ সালের জন্য তাদের লক্ষ্য ‘ভেতর থেকে ন্যাটো ও ইইউর পতন ঘটানো’।
এ প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে মলদোভা। পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্রেমলিনের অগ্রাধিকার তালিকায় ইউক্রেন জয় প্রথম এবং মলদোভার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া দ্বিতীয়। যদিও মলদোভা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর সদস্য নয়, তবু ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো এবং ইউক্রেনের মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকর্তারা বলেন, মলদোভা রাশিয়ার জন্য একটি আদর্শ ‘বিচহেড’ হয়ে উঠতে পারে, যেখান থেকে ইউক্রেন বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসন চালানো সম্ভব। তাদের মতে, পুতিন এখনও আশা করেন যে দক্ষিণ ইউক্রেনের একটি বড় অংশ দখল করে রাশিয়াকে মলদোভার সঙ্গে সংযোগকারী একটি স্থল করিডোর গড়ে তুলবেন।
যুদ্ধের শুরুর দিকে বেলারুশের প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্যে দেখানো রুশ সেনাদের সম্ভাব্য অভিযানের একটি মানচিত্রে দেখা গেছে, রুশ বাহিনী মলদোভার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় ঢুকে পড়ছে। ওই অঞ্চলে রুশ সেনাদের একটি দল রয়েছে। যদিও রাশিয়া সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। মলদোভার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা স্তানিসøাভ সেক্রিয়েরু বলেন, রাশিয়া মলদোভাকে ইউক্রেন এবং এর প্রধান প্রতিরক্ষা ও আর্থিক সহায়তাকারী ইইউর বিরুদ্ধে বৈরী কর্মকাণ্ডের জন্য একটি লঞ্চ প্যাড হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তার ভাষায়, ‘এসব কারণেই রাশিয়া গত কয়েক বছরে নজিরবিহীন সম্পদ বরাদ্দ করেছে।’ মলদোভায় রুশ হস্তক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘এগুলো সবই ভিত্তিহীন দাবি, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।’
প্রেসিডেন্ট মায়া সান্দুর পশ্চিমাপন্থি সরকার ইইউর সদস্যপদকে অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এতে সরকারটি ক্রেমলিনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ইউরোপীয় জোটে যোগদানের গণভোট এবং গত বছরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রতিটিতেই মায়া সান্দু ও তার দল পিএএসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সম্পদ ঢেলেছে মস্কো।
গত শরতে অনুষ্ঠিত মলদোভার পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময়ই এই কর্মকাণ্ড চরমে পৌঁছেছিল। এ নির্বাচনে সান্দুর দল ক্ষমতায় থাকবে, নাকি মস্কো সমর্থিত একটি জোটের হাতে ক্ষমতা যাবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনের জন্য মাসের পর মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল ক্রেমলিন। তাদের সাইবার যোদ্ধারা নির্বাচন কমিশনে অনুপ্রবেশও করে। ভোট কেনা ও অপপ্রচার কর্মসূচি পুরোদমে চালু ছিল এবং সার্বিয়ায় প্রশিক্ষিত রিক্রুট বাহিনী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত ছিল।
এক বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাচনি হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত মামলা তদন্ত করে আসা মলদোভার জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর সের্গিউ জামা বলেন, ভোট বিঘ্নিত করতে হাতেগোনা কয়েকজন রিক্রুটই যথেষ্ট ছিল। তার ভাষায়, ‘রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল একটি বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ জ¦ালিয়ে দেওয়া।’
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে পার্লামেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে পশ্চিম সার্বিয়ার একটি রিসোর্টে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করে রুশরা। অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই ছিলেন মলদোভার নাগরিক। জামার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন থেকে চার দিনের কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য প্রত্যেককে ৪০০ ডলার করে দেওয়া হতো, যা মলদোভান মানদণ্ডে বিশাল অর্থ। মলদোভান প্রসিকিউটর ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের ফোন থেকে নেওয়া ক্যাম্পের ভিডিওতে দেখা গেছে, ছদ্মবেশী পোশাক ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিহিত পুরুষরা অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। রুশ এজেন্টদের প্রতিষ্ঠিত একাধিক ক্যাম্পের মধ্যে এটি ছিল একটি।
মস্কোর বাইরে আরেকটি ক্যাম্পে ১০০ জনের বেশি তরুণ মলদোভান ‘দাহ্য দ্রব্য ও ঘরে তৈরি বিস্ফোরক প্রস্তুত ও ব্যবহার’ এবং ‘বিস্ফোরক বা অগ্নিসংযোগের জন্য বিশেষ সরঞ্জামযুক্ত ড্রোন’ পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেন বলে মলদোভান প্রসিকিউটররা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন। পশ্চিমা দুটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, এই প্রশিক্ষণ জিআরইউর তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। মস্কোর ক্যাম্পে অংশ নেওয়া মলদোভান রাজনৈতিক কর্মী ইউরি ভিতনিয়ানস্কি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্যাম্পের উদ্দেশ্য ছিল তরুণ রুশ রাজনীতিকদের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক’ তৈরি করা। এর বাইরে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। ক্যাম্পটি রুশ গোয়েন্দাদের তত্ত্বাবধানে চলছিল এমন কিছু সম্পর্কে তিনি জানতেন না বলেও দাবি করেন। মলদোভান কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে যে ক্যাম্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য সবাই জানতেন না।
কিছু অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, তারা প্রশিক্ষণ সেশনে অংশ নিতে অস্বীকার জানিয়েছিলেন। বসনিয়ার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগ দেওয়া ম্যাক্সিম রসকা পরে মলদোভান আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে অংশ নিতে অস্বীকার করলে এক রুশ প্রশিক্ষক তার মুখে ঘুসি মেরে একটি দাঁত ভেঙে ফেলেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার ক্যাম্পে অংশ নেওয়া তিনজনকে মলদোভায় ফেরার পথে গ্রেফতার করা হয়। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের কাছে গ্রেনেড ফেলার সরঞ্জামসহ ড্রোনের যন্ত্রাংশ ছিল। এ ছাড়া তাদের কাছে ‘রাশিয়ান কুইজিন : দ্য এবিসিস অব হোমমেড টেরোরিজম’ শিরোনামে একটি ম্যানুয়ালও পাওয়া গিয়েছিল।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে মলদোভার প্রাদেশিক শহর তারাক্লিয়ায় সরকারবিরোধী সেøাগান লেখা প্ল্যাকার্ড ও ঝাড়ু হাতে গরমের মধ্যে জড়ো হয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভটি স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়েছিল। মস্কোর ক্যাম্পে যাওয়া মলদোভান কর্মী ভিতনিয়ানস্কি সেই বিক্ষোভে ছিলেন। স্থানীয় টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি এটিকে ‘স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
কিন্তু আসলে এটি প্রায় ৭৮০ মাইল দূরে মস্কো থেকে আয়োজন করেছিলেন রাশিয়ায় বসবাসরত ইসরাইলি-মলদোভান অলিগার্ক ইলান শোরের হয়ে কাজ করা এজেন্টরা। বিক্ষোভের কয়েক দিন আগেই শোরের সহযোগীরা অনলাইন মেসেজিং সেবা টেলিগ্রাম ব্যবহার করে হাজার হাজার মলদোভানকে বার্তা পাঠান। তাদের নগদ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঝাড়ু হাতে শহরের জেলা কাউন্সিল ভবনে হাজির হতে বলা হয়। এই ঝাড়ু ছিল ‘এই ধরনের লোকদের ঝেড়ে ফেলার’ প্রতীকী উপকরণ। ওই বার্তায় বলা হয়েছিল, ‘ভ্রমণ ব্যয় ও দৈনিক ভাতা প্রদান করা হবে।’
মস্কোভিত্তিক শোরের আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁস হওয়া বিশাল একটি নথির অংশ ছিল এই বার্তাগুলো। এই প্রতিষ্ঠানটি রুশ কোম্পানিগুলোকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করে। নথিতে শোরের অপারেশনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কর্মীদের নাম, অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য ছিল। এতে দেখা গেছে যে ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মলদোভানকে এই কাজে নেওয়া হয়েছিল। এই নথিতে শোরের হয়ে কাজ করা কর্মীদের মধ্যে চ্যাট বার্তার শত শত পৃষ্ঠাও ছিল। শোরের প্রকাশ্য নাম ছিল ‘ট্রাভোল্টা’।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মলদোভান প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সবকিছু মিলে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত অভিযান শোর তদারকি করছিল। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটি বিক্ষোভের চেয়ে বড় কিছু, মলদোভার রাজনীতিকে প্রভাবিত করা। নগদ অর্থের বিনিময়ে তালিকাভুক্তদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কনটেন্ট পোস্ট করতে এবং সাজানো সমাবেশে অংশ নিতে বলা হয়েছিল। সেখানে মলদোভানদের সান্দু, তার দল এবং ইইউর সদস্যপদের বিরুদ্ধে ভোট দিতে উৎসাহ দেওয়া হতো।
তালিকাটি শোরের হয়ে কাজ করা এক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর একটি ক্লাউড ফোল্ডারে সংরক্ষিত ছিল, যা ইন্টারনেটে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং টাইমস সেটি পর্যালোচনা করেছে। টাইমস তথ্যভান্ডারে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং তথ্যভান্ডারে থাকা জিপিএস স্থানাংক অনুসরণ করে মস্কোর বাইরে স্কোলকোভো ইনোভেশন সেন্টারের কাছে ওই প্রকৌশলীর ঠিকানা খুঁজে বের করে এই তথ্যভান্ডারটি যাচাই করেছে। রাশিয়ায় ওই প্রকৌশলীর সঙ্গে টাইমস যোগাযোগ করার পর নথিটি অনলাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
শোরের অপারেশন থেকে ইন্টারনেটে ফাঁস হওয়া অন্য নথিতে দেখা গেছে, ইইউতে যোগদানের গণভোটের আগের চার মাসে ২০২৪ সালে ৩৮ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ডলার বণ্টন করা হয়েছিল। কর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে টাইমস। বাকিরা প্রকাশ্যেই পরিচিত।
ফাঁস হওয়া এই নথির অস্তিত্ব ও এতে থাকা উপাদান সম্পর্কে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল মলদোভার শীর্ষস্থানীয় অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘জিয়ারুল দে গার্দা’ (জেডজি)। মলদোভান কর্তৃপক্ষের কাছে ইলান শোর ভালোভাবেই পরিচিত। ২০১৯ সালে ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে মলদোভা ছাড়েন তিনি। তারপর থেকে রাশিয়ায় বসবাস করছেন।
পশ্চিমা তিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পুতিন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সদস্য সের্গেই কিরিয়েঙ্কোর কাছে জবাবদিহি করেন। কিরিয়েঙ্কোর ওপর মলদোভার মতো ক্রেমলিনের প্রভাব বলয়ের মধ্যে বিবেচিত দেশগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র শোরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে এ ব্যাপারে শোর মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
তথ্যভান্ডারে দেখা গেছে, তালিকাভুক্তকরণ ও রিক্রুটদের সমন্বয়ের জন্য শোরের ডেভেলপাররা টেলিগ্রামে ২৪০টি চ্যাটবট তৈরি করেছিলেন। ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও পুলিশ ইনফরমারদের চিহ্নিত করার জন্য কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ছিল। নতুন রিক্রুটদের ‘সহানুভূতিশীল’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। তাদের ওপরে ৩৫ হাজার ‘কর্মী’ এবং সবার ওপরের স্তরে ছিল ১ হাজার ২০০ জন স্থানীয় ব্যবস্থাপক। এই অভিযানটি পিরামিডের মতো বেড়ে উঠেছিল। প্রায় ৯৯ হাজার সদস্য এই অভিযানে ইতিমধ্যে জড়িত থাকা কারও না কারও মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন। স্প্রেডশিটে দেখা গেছে, মলদোভান রিক্রুটরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার বার্তা পোস্ট করে ইইউ গণভোট ও সান্দুর নিন্দা জানিয়েছেন।
গত জুনে ২০২৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনকে দুর্বল করতে শোরের প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত চার মলদোভানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর মধ্যে ভিতনিয়ানস্কিও ছিলেন। ইইউ জানায়, তিনি শোরের কাছ থেকে মাসিক বেতন পান এবং ‘সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল ও উৎখাতের চেষ্টায়’ যুক্ত ছিলেন। হ্যাক করা নথিতে দেখা গেছে, ভিতনিয়ানস্কি প্রতিবার প্রায় ২ হাজার ৩০০ ডলার করে পেমেন্ট পেয়েছেন।
ক্রেমলিনের এই অভিযানে যাজকদেরও যুক্ত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের গ্রীষ্ম থেকে শত শত যাজক রাশিয়া সফর করেন। তারা পবিত্র স্থান ও গির্জার জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দেশে ফেরার আগে যাজকরা রুশ ব্যাংক প্রমসভিয়াজ ব্যাংকের ইস্যু করা একটি ডেবিট কার্ডের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এই ব্যাংকের সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ রয়েছে এবং এটি শোরের আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের ৪৯ শতাংশের মালিক। টাইমসের পর্যালোচনায় থাকা চুক্তির একটি অনুলিপিতে যাজকরা নিজেদের ‘ইভরাজিয়ার’ কর্মচারী হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ক্রেমলিন সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠন। পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে রুশপন্থি নীতির পক্ষে প্রচার চালায়। শোর এই সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন।
প্রায় ১ হাজার ডলারের বিনিময়ে যাজকদের কাজ ছিল মলদোভার ইইউ সদস্যপদের বিষয়ে গণভোটকে প্রত্যাখ্যান এবং পশ্চিমাপন্থি নীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে অনুসারীদের আহ্বান জানানো। মলদোভান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শত শত যাজক এই নগদ অর্থ নিয়েছেন। হ্যাক করা নথিতে ফাদার ঘেওরঘে তুরসুলেতকে ‘একজন নির্ভরযোগ্য সম্পদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং তার নামে প্রায় ১ হাজার ডলার পেমেন্টের রেকর্ড রয়েছে। জ্যেষ্ঠ এক মলদোভান কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে তিনি রাশিয়ায় তীর্থযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন।
আরেক মলদোভান যাজক ফাদার পাভেল পেত্রোভ রুশপন্থি যাজকদের একটি দলের সঙ্গে যুক্ত। তবে তিনি তীর্থযাত্রায় যাননি বলে ওই কর্মকর্তা জানান। ২০২৪ সালের নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে গির্জায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইইউর নিন্দা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র? কেমন গণতন্ত্র আপনাদের ওপর ইউরোপ থেকে আনা সব ময়লা চাপিয়ে দেয়?’ মিশ্র লিঙ্গের বাথরুম সম্পন্ন স্কুলগুলোরও নিন্দা জানান তিনি।
তার মোবাইল ফোনের ভিডিওতে ধারণকৃত এই ধর্মোপদেশটি পরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘নর্ডনিউজ’ প্রকাশ করে, যা টাইমস যাচাই করে দেখেছে। এতে তিনি বলেন, ‘আমরা, জনগণ, আমরা কী চাই? সডোম ও গোমোরাহ? যাতে ঈশ্বর আমাদের জীবন্ত পুড়িয়ে দেন? তিনি আমাদের পুড়িয়ে দেবেন।’ তবে ফাদার তুরসুলেত ও ফাদার পেত্রোভ মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
রুশরা প্রায় সফলই হয়ে যাচ্ছিল। ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচনের দিন তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। প্রসিকিউটর জামার ভাষ্য অনুযায়ী, সার্বিয়ায় প্রশিক্ষিত এজেন্টরা রাজধানী চিসিনাউসহ বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রস্তুতি নিয়েছিল। ভিড়ের মধ্যে একজন আরেকজনকে চেনার জন্য তারা হলুদ ও নীল রঙের ব্যাজ পরেছিল। কয়েকজনের কাছে অগ্নিসংযোগকারী ডিভাইসও ছিল। রুশ হ্যাকাররা মলদোভার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনে অনুপ্রবেশ করেছিল এবং হাজার হাজার ব্যক্তিগত রাউটারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল বলে জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ মলদোভান কর্মকর্তা।
তবে মলদোভান কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত ছিল। ভোটের আগের কয়েক সপ্তাহে মলদোভান পুলিশ শত শত বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ক্যাম্পে অংশ নেওয়া বা শোরের প্রকল্পের অংশ হিসেবে অর্থ নেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে। মলদোভার সাইবার বিশেষজ্ঞরা পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় হ্যাকিং হামলা ঠেকিয়ে দিয়েছেন।
বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও গুরুতর কোনো সহিংসতা হয়নি। সহিংসতার ষড়যন্ত্রের সন্দেহে কয়েকজনকে পুলিশ যখন গ্রেফতার করে, তখন গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা দাবি করেন যে তাদের কাছে থাকা অগ্নিসংযোগকারী ডিভাইসগুলো একটি ‘জেন্ডার রিভিল পার্টির’ জন্য ছিল বলে জামা জানিয়েছেন। বিদেশে থাকা মলদোভান প্রবাসীদের সমর্থনের জোরেই মূলত সান্দুর দল ৫০ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়।
ক্রেমলিনের জন্য তার এই জয় খুব বড় কোনো ব্যর্থতা ছিল না। কারণ রুশ হস্তক্ষেপ ঠেকাতে মলদোভান সরকারকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে এবং বিপুল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীকে নামাতে হয়েছে। এ ছাড়া সান্দুর প্রতিপক্ষদের গণহারে গ্রেফতারকে ক্রেমলিনের মিত্ররা কর্তৃত্ববাদী দমনপীড়নের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে অপপ্রচারে ব্যবহার করেছে।
এরপর থেকে ক্রেমলিন তাদের কর্মকাণ্ড আরও বাড়িয়েছে। মার্চের শুরুতে মলদোভার সীমান্তের কাছে একটি ইউক্রেনীয় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে রুশ হামলা ইউক্রেন ও মলদোভার একটি বড় এলাকার পানি সরবরাহ দূষিত করে। এরপর পশ্চিম ইউক্রেনে একটি উচ্চ ভোল্টেজ লাইনে রুশ ড্রোন আঘাত হানে, যা মলদোভার বিদ্যুতের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করে।
এতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এমন অবস্থা যে প্রেসিডেন্টের কমপ্লেক্সসহ কিছু সরকারি ভবনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য প্রায়ই বাতি বন্ধ থাকতে দেখা যাচ্ছে এবং কর্মীদের টর্চলাইট নিয়ে জানালাবিহীন করিডোরে চলাফেরা করতে দেখা গেছে।
সময়ের আলো/এসএকে