তেহরানের সঙ্গে বোঝাপড়ায় ব্যস্ত ট্রাম্প। আর সেই সুযোগেই যেন এশিয়ায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখছে চীন। ইরান যুদ্ধের চাপ সামলাতে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরে যাচ্ছে শেষ মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। উদ্দেশ্য ২৬৬ দিন ধরে অভিযানে সমুদ্রে থাকায় নাবিকদের মনোবল ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে প্রতিস্থাপন।
লিংকনের মিশন গত মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের সময় বাড়ায় ক্লান্ত মার্কিন নাবিক। দেখা দিয়েছে সরবরাহ সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। একই সময়ে এশিয়ায় তৈরি হচ্ছে মার্কিন সামরিক শূন্যতা। জর্জ ওয়াশিংটন সরে গেলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সাময়িকভাবে কোনো মার্কিন ক্যারিয়ার থাকছে না। এই শূন্য সামরিক উপস্থিতি অল্প সময়ের জন্য হলেও চীনের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
এতে বার্তা একটাই—‘আমেরিকা কি সত্যিই এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে?’
ইতোমধ্যে স্কারবোরো শোলের কাছে সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীন। ওই অঞ্চল নিয়ে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। আবার ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। একই সময়ে জাপানের সঙ্গেও চীনের একাধিক সামুদ্রিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধ চলছে। সম্প্রতি জাপানের একটি দ্বীপের কাছাকাছি চীনের একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার লাইভ-ফায়ার মহড়াও চালিয়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে ইরান, অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগর এবং তৃতীয় দিকে জাপান— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রকে একই সময়ে সামরিক মনোযোগ দিতে হচ্ছে। ফলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা কীভাবে এসব অঞ্চলে ভাগ করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপও বাড়ছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড প্রায় ১১ মাসের দীর্ঘ মিশন শেষে দেশে ফিরেছে। এই সময়ের মধ্যে জাহাজটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং নাবিকদের থাকার ব্যবস্থাতেও সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সমুদ্রে কাটিয়েছে ২৪০ দিনেরও বেশি সময়। ফলে শুধু যুদ্ধের চাপ নয়, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে নাবিক ও যুদ্ধজাহাজ দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।
এরপর সামনে রয়েছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ পরিচালনার পর একের পর এক বিমানবাহী রণতরী মেরামতের জন্য পাঠাতে হলে মার্কিন নৌবাহিনীর সামনে বড় ধরনের জট তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ আজ কোনো ক্যারিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে থাকলেও আগামীকাল সেটিকে শিপইয়ার্ডে পাঠাতে হতে পারে। এর ফলে আগামী কয়েক বছরেও বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই মার্কিন নৌবাহিনী ছোট আকারের যুদ্ধজাহাজসহ অন্যান্য সামরিক সক্ষমতার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে।
তাহলে কি এই পরিস্থিতি চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে? এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে বেইজিং বড় কোনো পদক্ষেপ নেবে। তবে পরিস্থিতিকে তারা নিজেদের কৌশলগত সুবিধার জন্য কাজে লাগাতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের মনোযোগ এখন ইরানের দিকে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলো মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত এবং একই সময়ে এশিয়ার মার্কিন মিত্রদের উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, চীন কি তুলনামূলকভাবে কম প্রতিরোধের সুযোগ পেয়ে নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইরানকে চাপে রাখতে গিয়ে ট্রাম্প কি এশিয়ায় চীনের জন্য কৌশলগত জায়গা তৈরি করে দিচ্ছেন? যুদ্ধের কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যে হলেও এর কৌশলগত প্রভাব যে সুদূর এশিয়াতেও পৌঁছে যাচ্ছে, সেটিই এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ