নওগাঁয় অনুমতি বিহীন কোল সিএফ-৩এল নামক একটি ওষুধ প্রেসক্রিপশন করে রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে মো. মাহবুবুর রহমান নামের এক ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে সিল মেরে ওই ওষুধটি দেদারসে লেখা হচ্ছে। সেই ওষুধে আবার সাদা কাগজে লেখা আছে বাজার মূল্য। এছাড়া হারবালের জিক্যাপ ক্যাপসুল ও ভলিজেল ম্যাক্স নামক আরও দুটি ওষুধ সিল মেরে লেখা হচ্ছে। এই দুটি ওষুধ নিয়েও রয়েছে সন্দেহ। আর এসব বাজারজাতকরণ করছে এমআর ট্রেডিং এর মাধ্যমে মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি। ফলে ওষুধের গুণগত মান নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। পাশাপাশি পকেট কাটা যাচ্ছে সেবা নিতে আসা শত শত রোগীর। এছাড়া প্রায় প্রতিটি প্রেসক্রিপশনে একই রকমের বেশ কিছু টেস্ট দেওয়া তো আছেই।
জানা যায়, ডাক্তার মাহবুব রহমান শহরের কাজীর মোড়ে হলিপ্যাথ ডায়াগনস্টিক ল্যাবে প্রতি শুক্রবার রোগী দেখছেন। সেখানে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা শত শত রোগীর প্রেসক্রিপশনে সিল মেরে লেখা হচ্ছে ভিটামিন ডি-৩ ইনজেকশন আইপি নামক কোল সিএফ-৩এল। যার প্যাকেটের গায়ে এমআরপি (বাজার মল্য) সাদা কাগজে হাতে লেখা আছে ৪ শত টাকা। ওষুধটির গায়ে ভারতের একটি কোম্পানির ঠিকানা ও তাদের ওয়েবসাইট ঘেটে এই ওষুধের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কোন আমদানীকারকের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে এর কোনো তথ্য দিতে পারেনি কেউ। এছাড়াও ওষুধের প্যাকেটের গায়ে নেই ঔষধ প্রশাসনের কোনো অনুমতি নম্বর।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ওষুধ লেখার জন্য ডাক্তারের সহযোগী হিসেবে বসে আছেন (উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়া) মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ সব ওষুধ বাজারজাত করণের সাথে জড়িত এই মাহফুজ। রোগীর প্রেসক্রিপশনে তিনিই লিখে দিচ্ছেন ডাক্তারের বলা ওষুধ। মাঝে মাঝে তিনিও দুই একটি করে ওষুধের কথা মনে করে দিচ্ছেন। পছন্দ হলে ডাক্তার হ্যাঁ বলছেন, পছন্দ না হলে অন্য আরেকটি ওষুধের কথা বলছেন। এরপর সিল মেরে দেওয়া হচ্ছে এসব ওষুধ। সরেজমিনে গিয়ে এরকম একাধিক প্রেসক্রিপশনের প্রমাণও মিলেছে।
এসব ওষুধ সেবন করে শারীরিকভাবে ক্ষতির মুখেও পড়ছেন একাধিক রোগী। দেখা দিয়েছে নানান পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া।
গত ১০ জুলাই সুনিতা রাণী নামে এক রোগী ঘাড়ের ব্যথার জন্য এসেছিলেন চিকিৎসা সেবা নিতে। ৮০০ টাকা দিয়ে সিরিয়াল নিয়ে বসে ছিলেন তিনি ও তার ছেলে। প্রথমেই দেওয়া হলো এক্সরে টেস্ট, সিভিসি, ডায়াবেটিকস। এরপর রিপোর্টসহ দেখাতে গেলে তিনি অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশি সিএফ-৩এল ওষুধটি লিখে দিয়ে এক গ্লাস গরম দুধের সাথে মিশে খেতে বলেন। এবং ২১ দিন পর আরও দুটি ওষুধ একই নিয়মে খেতে হবে।
ভুক্তভোগী সুনিতা বলেন, ওষুধটি খাওয়ার পর আমি প্রায় না বাঁচা হয়ে গিয়েছিলাম। খুব গ্যাস হয়েছিল। গলার মধ্যে হাত ঢুকে দিয়ে বমি করতে হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ কিছু খেতে পারিনি। খুব কষ্ট হয়েছিল। আমি আর ওই ওষুধ খাবো না।
তার মেয়ে শিল্পী সরকার বলেন, মা গিয়েছিল ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু নওগাঁ থেকে আসার পর আমার মাকে নার্ভাস মনে হচ্ছিল। এসে না খেয়েই শুয়ে পড়ে। একসময় মুখের মধ্যে হাত দিয়ে বমি করার চেষ্টা করে। এভাবে সারারাত আমরা ঘুমাতে পারিনি। খুব ভয়ে ছিলাম।
ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি আছে কিনা এমন বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. এর সহকারী মাহফুজ বলেন, এরকম আরও আছে। এগুলো বাজারে হাজার হাজার চলে। শাহানুর নামের এক ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে আমরা চালাই।
আর ক্যাপসুল ডি ক্যাপ আমার জানিয়ে তিনি বলেন, এটি হারবাল প্রোডাক্ট। আমি প্রেসক্রিপশন করি। আমি সিল দিই না। তবে প্রেসক্রিপশনে অন্য ওষুধ লিখে দিই। আর প্রেসক্রিপশনে লেখা যাবেনা সেটা আপনাকে কে বলেছে? শুধু কি ডাক্তাররাই লিখতে পারবে? প্রশ্নের সুরে বলেন তিনি।
এরপরই গুডলাইট কোম্পানির লোক পরিচয় দিয়ে ফোন দেন শাহানুর নামের ওই ব্যক্তি। তিনি হুমকিস্বরূপ বলেন, আপনি মাহফুজ নামের ব্যক্তিকে ফোন দিয়েছেন কেন? মাহফুজ কোম্পানির লোক, সে সাপ্লাই দিতেই পারে। ডাক্তার কী প্রোডাক্ট লিখলো, সেটা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করবেন।
আপনি কি আমাকে চার্জ করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাহফুজ ও আমি প্রতিবেশী ভাই। এছাড়া আমাদের ওষুধ কোম্পানির নওগাঁ জেলা সমিতির সেক্রেটারি আমি, তাই আপনাকে ফোন করলাম।
জানতে চাইলে ডাক্তার মাহবুবুর রহমান বলেন, এসব ওষুধ বৈধ নাকি অবৈধ তা আমার দেখার বিষয় নয়। যদি অনুমোদন না থাকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কী করছে? তাদের দায়িত্ব এসব দেখার। একসময় গর্ব করে বলেন, অবৈধ ওষুধও আমি লিখতে পারব। আর প্রতিটা ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মাহফুজ আমার সহকারী। ফলে সে প্রেসক্রাইব করে, আমি বলে দিই ও লিখে।
নওগাঁ ঔষধ প্রশাসনের পরিদর্শক রিতা রায় বলেন, এসব ওষুধে আমাদের অনুমতি নেই। কারণ ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি থাকলে অবশ্যই ওষুধের গায়ে এনওসি নং লেখা থাকবে। এছাড়া কোনোভাবেই সাদা কাগজে বা হাতে লিখে এমআরপি মূল্য লেখা যাবে না।
জানতে চাইলে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো ওষুধ লেখা যাবে না। কেউ লিখে থাকলে ওটা নির্দিষ্ট করে দেন, তাহলে আমরা তদন্ত করে দেখবো কেন লিখলো।
সময়ের আলো/আতা