সকালের আলো ফুটতেই বিদ্যালয়ের পথে হাঁটা শুরু করেন শিক্ষক ইলা বড়ুয়া। বয়সের ভার শরীরে, কিন্তু হাতে এখনো চক-ডাস্টার। শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই যেন বদলে যায় তার পরিচয়। সামনে একদল শিক্ষার্থী, হাতে পাঠ্যবই-আর শুরু হয় পাঠদান।
একসময় প্রতিদিনের মতোই ছিল এই দৃশ্য। তবে সেই সময় তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক। এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। ছয় বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে তার চাকরিজীবন। কিন্তু শেষ হয়নি শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক।
২০১৯ সালে অবসর নেওয়ার পরও প্রতিদিন বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন ইলা বড়ুয়া। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নেন তিন থেকে চারটি ক্লাস। নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ান হিসাববিজ্ঞান। প্রয়োজন হলে অষ্টম শ্রেণির বাংলা ক্লাসও নেন। বয়স তাকে থামাতে পারেনি; বরং দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা এখনো বিলিয়ে দিচ্ছেন নতুন প্রজন্মের মাঝে।
ইলা বড়ুয়ার শিক্ষক হওয়ার গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। বাবা ভূপেন্দ্র লাল বড়ুয়া ছিলেন সিলেটের একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। ছোটবেলায় বাবাকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াতে দেখে ইলা বড়ুয়ার মনেও জন্ম নেয় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়েই শুরু হয় তার পথচলা। সে থেকে থেমে নেই তিনি।
১৯৮১ সালে হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ইলা বড়ুয়া। তবে পরের বছর স্বামীর চাকরির সুবাদে পাড়ি জমান ঢাকায়। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনি স্কুলে। এরপর ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মাদারটেক বাসাবো বাগানবাড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
১৯৮৮ সালে আবার ফিরে আসেন নিজের পুরোনো কর্মস্থল হাইদচকিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর কেটে যায় কয়েক দশক। এই দীর্ঘ সময়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। হিসাববিজ্ঞান ছিল তার মূল বিষয়।
শুধু বইয়ের পাঠ নয়, শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার পাঠও দিয়েছেন তিনি। তার সামনে বসে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থী এখন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সময় বদলেছে, শিক্ষার্থীদের প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে বিদ্যালয়ের পরিবেশও। কিন্তু ইলা বড়ুয়ার শ্রেণিকক্ষের প্রতি ভালোবাসা বদলায়নি।
অবসরের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাকে পুরোপুরি বিদায় দিতে চায়নি। তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা নতুন প্রজন্মের কাজে লাগুক- এমন প্রত্যাশা থেকেই ২০১৯ সাল থেকে অতিথি শিক্ষক হিসেবে আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরেছেন তিনি।
প্রতিদিন তিন-চারটি ক্লাস নেওয়া এখন তার নিয়মিত রুটিন। কখনো হিসাববিজ্ঞানের জটিল অঙ্ক বোঝান, কখনো বাংলা পড়ান। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেন ধৈর্য নিয়ে। বয়সের ছাপ শরীরে থাকলেও পাঠদানের সময় তার কণ্ঠে কিংবা চোখে দেখা যায় না ক্লান্তি।
একসময় যেসব শিক্ষার্থী তার সামনে বেঞ্চে বসে খাতা-কলম খুলে পাঠ নিত, তাদের কেউ কেউ আজ নিজেরাই পরিবার-সমাজে প্রতিষ্ঠিত। অথচ তাদের শিক্ষক এখনো একই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছেন।
কারও কাছে শিক্ষকতা হয়তো একটি চাকরি। নির্দিষ্ট বয়সে যার সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু ইলা বড়ুয়ার কাছে শিক্ষকতা যেন তার চেয়েও বেশি কিছু- এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। ছয় বছর আগে অবসর এসেছে। বদলেছে কর্মজীবনের পরিচয়। কিন্তু বদলায়নি শ্রেণিকক্ষের প্রতি টান।
জ্যেষ্ঠ এ শিক্ষক ইলা বড়ুয়া বলেন, যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল বাবাকে দেখে, সেই স্বপ্নের পথচলা এখনো থামেনি। থামাতে চাইনা। প্রতিদিন তিন-চারটি ক্লাস, শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্ন আর পাঠদানের ব্যস্ততা- এসবের মধ্যেই যেন আমি নিজের আনন্দ খুঁজে পাই।’
দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে অনেকেই যখন বিশ্রামের জীবন বেছে নেন, তখনও তিনি প্রতিদিন ফিরে আসেন শ্রেণিকক্ষে। হাতে চক, সামনে শিক্ষার্থী আর সঙ্গে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা। কারণ তার কাছে শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়- এ এক আজীবনের দায়িত্ব। পরম দায়িত্ববোধের জায়গায় নিরন্তর দাঁড়িয়ে।
সময়ের আলো/জোই