ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাস পার করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সময়ে সরকারের কাজের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে- দলটির ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের ৩১ দফা কতটা বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। কারণ ৩১ দফা শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, প্রশাসন ও নাগরিক অধিকারকে নতুন কাঠামোয় সাজানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদকে সামনে রেখে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ মাস পূর্তিতেও সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের আস্থা, নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার গঠনের পর বিগত ৬ মাসে ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে সরকার সফলতার ট্র্যাকেই আছে। নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফ্যাসিবাদী আমলের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, প্রশাসনের অনিয়ম, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনে গতি ফেরানোয় জোর দিয়ে নতুন করে রাষ্ট্রসংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগ ৮০ শতাংশ হয়েছে। নেতাদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে সফল হয়েছেন। তিনি পরাজিত শক্তির প্রতি সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।
গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার শপথ নেওয়ার প্রথম দিন সংসদীয় সভায় ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, তা হচ্ছে- সরকারিভাবে সংসদ সদস্যরা কোনো জমি এবং শুক্লমুক্ত গাড়ি নেবেন না, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফর করেছেন মুসলিম দেশ মালয়শিয়ায়। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ চীন সফর করেছেন। দুটি দেশ সফরেই বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীন-বাংলাদেশ ঐতিহাসিক ১৩ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এই সফরেই মালয়েশিয়া জনশক্তি রফতানির জট খুলেছে।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই স্বাস্থ্য কার্ড ও প্রবাসী কার্ড চালু হবে। খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে, ৬ মাসের দেওয়া টার্গেটের প্রায় শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
গুমের শিকার পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সরকারিভাবে তালিকা প্রণয়ন ও স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়ন ও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংস্কার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অধিক গুরুত্ব দিয়ে নানা কার্যক্রম নেওয়া এবং বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা, তৈরি পোশাক শিল্প বিকাশে সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যুব উন্নয়নে স্বাবলম্বী করে তোলা পদক্ষেপ, রাজধানীসহ সব শহরের যানজট নিরসনে এআই ট্রাফিক পদ্ধতি চালু ও রাজধানীর আন্তঃবাস টার্মিনাল স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন পে-স্কেল খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অচিরেই বাস্তবায়ন করা হবে। বন্ধ অলাভজনক রাষ্ট্রীয় শিল্প-কলকারখানা চালু ও বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া শুরু, আকস্মিক বন্যা মোকাবিলা প্রধানমন্ত্রী ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং বন্যা পূর্বাভাসের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি সব অফিসে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আগের সরকারের সময়কার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়মুক্তি আইন বাতিল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী জুলাই সনদ ও বিএনপি ঘোষিত ‘৩১-দফা’ বাস্তবায়নে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার ৩১ দফাকে ভিত্তি হিসেবে সামনে রেখেছে। ৩১ দফার অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ছয় মাসে সব দফার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
প্রশাসন, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জমে থাকা সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তন ও উন্নয়নের সুচনা হয়েছে। জনগণ এর ইতিবাচক ফলাফল পেতে শুরু করেছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি তার দেওয়া ৩১ দফার আলোকে সরকার পরিচালনা করছে। সরকার গঠনের পর বিগত ৬ মাসে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফলতা অর্জন করেছে। শতভাগ না হলেও সফলতা কাছাকাছি।
তিনি বলেন, বর্তমানে যে গ্যাস-জ্বালানির সংকট রয়েছে এটা সরকারের হাতে নেই। বহির্বিশ্ব এবং এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে এই সংকট দেখা দিয়েছে। তারপরও সরকার এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। বাড়তি টাকা দিয়ে এলএনজি কেনা হচ্ছে। হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, আবার কোথাও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে।
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারকে প্রথমে প্রস্তুতি নিতে হয়, প্রশাসনকে গুছিয়ে নিতে হয় এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ইমপ্লিমেন্টিং ইন্সট্রুমেন্ট’ প্রস্তুত করতে হয়। এই প্রস্তুতি পর্বে সময় লাগে। পরবর্তী ছয় মাসে কর্মসূচিগুলো আরও জোরালোভাবে এগিয়ে যাবে এবং সফলভাবে বাস্তবায়ন হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। ৬ মাসে এর অনেক কিছুই এখন দৃশ্যমান।
পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সময়ের আলোকে বলেন, সরকারের ১৮০ দিনে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যে টার্গেট ছিল তারচেয়ে বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৩১ দফা আমাদের অঙ্গীকার, তা পূরণে সরকার কাজ করছে।
সময়ের আলো/এসএকে