মার্কিন প্রেসিডেন্সির ইতিহাসে নিজ কৃতকর্মের দায়ভার এড়িয়ে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এপির প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। দুর্বল অর্থনীতি আর এখনও চড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের দাবি, পূর্বসূরি জো বাইডেন তাকে এই বোঝা দিয়ে গেছেন। অথচ ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেন ক্ষমতা ছেড়েছেন ১৮ মাসেরও বেশি সময় আগে।
এ ছাড়া ট্রাম্প নিজেই একসময় ক্ষমতা হাতে পেলেই অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুলের সমস্যাগ্রস্ত সংস্কার কাজের প্রসঙ্গে রিপাবলিকান ট্রাম্পের জোর দাবি, এটি নাশকতার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও তারই নিয়োগ দেওয়া এক প্রসিকিউটরের দফতর জানিয়েছে, নিম্নমানের কাজই এ ক্ষতির কারণ।
ইরান যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়েছে। এর জেরে কমেছে ট্রাম্পের জনসমর্থন, বিশ্ব অর্থনীতিতেও তীব্র ধাক্কা এসেছে। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের দাবি, এসব মূলত তার পূর্ববর্তী ভীরু প্রেসিডেন্টদের ভুলের মাশুল- যারা তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা ঠেকানোর প্রায় ৫০ বছরের সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন। চটুল ও চটকদার স্লোগানগুলোকে সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, আধুনিক যুগের সব প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনো মাত্রায় দায়ভার অন্যদের কাঁধে চাপান। তারা প্রায়ই পূর্বসূরি কমান্ডার-ইন-চিফ, কংগ্রেস অথবা উভয়কেই দোষারোপ করেন।
তবে ট্রাম্প এই প্রবণতাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। বাস্তবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন, যার মাধ্যমে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে তিনি
থাকবেন কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হলে কোনো কিছুর দায় তিনি নেবেন না। ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক নিকোল অ্যানস্লোভার বলেন, যে প্রেসিডেন্সিয়াল নেতৃত্ব বা যেকোনো ধরনের নেতৃত্বের একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো দায় স্বীকার করা।
ট্রাম্পের অন্যদের দিকে আঙুল তোলার এই প্রবণতাটি নভেম্বর মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ক্রমাগত আলোচনায় আসছে। ভুল স্বীকার করতে এই অনীহা অনেক সময় তাকে সমস্যাগুলোর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার দিকে ঠেলে দেয়।
এটি কঠিন লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান নেতাদের এমন এক পরিস্থিতির মুখে ফেলে দিচ্ছে, যেখানে ভোটারদের উদ্বেগ নিরসনে তাদের আশ্বস্ত করার পথ কঠিন হয়ে পড়ছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প কেবল হাত গুটিয়ে বসে সমস্যাগুলোকে উপেক্ষা করছেন না, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করতে কাজ করছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেন, প্রেসিডেন্ট যথাযথভাবেই তার পূর্বসূরিদের ব্যর্থতাগুলোকে মোকাবিলা করছেন এবং একই সঙ্গে আমেরিকান জনগণের জন্য বড় সাফল্য এনে দিতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
তিনি এমন কিছু নীতির কথা উল্লেখ করেন, যা তার মতে রিপাবলিকানদের নির্বাচনি প্রচারে তুলে ধরার মতো। এর মধ্যে রয়েছে কর ছাড়, প্রেসক্রিপশনের ওষুধের দাম কমানোর উদ্যোগ, অভিবাসন ও মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজার শক্তিশালী করা।
ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট থাকার সময় নিজের ডেস্কে ‘দ্য বাক স্টপস হিয়ার’ লেখা একটি ফলক রাখতেন। কথাটি এসেছে ‘পাস দ্য বাক’ (অন্যের ওপর দায় চাপানো) প্রবাদ থেকে। ১৯৫৩ সালে বিদায়ি ভাষণে ট্রুম্যান বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট যিনিই হবেন, সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে। তিনি অন্যদের ওপর দায় চাপিয়ে পার পেতে পারেন না। অন্য কেউ তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এটি তারই কাজ।
বছরের পর বছর ধরে ব্যবহৃত এ প্রবাদের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প নিজেও একসময় একই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করতেন।
২০১৩ সালে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, যা-ই ঘটুক না কেন, দায়িত্ব আপনার নিজের। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার জন্য মনোনীত হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ব্যবস্থাটিকে আমার চেয়ে ভালো আর কেউ বোঝে না, তাই আমিই এটি ঠিক করতে পারব। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি প্রায়ই ইঙ্গিত দিয়েছেন, সমাধান ও দোষÑ উভয়ই অন্য কারও।
২০১৯ সালে সরকারের দীর্ঘ শাটডাউনের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, দায়ভার সবার ওপরই বর্তায়। আবার ২০২০ সালে, যেদিন তিনি করোনা মহামারি মোকাবিলায় জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেন, সেদিন কোভিড পরীক্ষার ঘাটতির প্রসঙ্গে বলেন, আমি এর কোনো দায় নেব না।
অ্যানসেøাভার বলেন, জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন ট্রুম্যান। যদিও তার পূর্বসূরি ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে এমন একটি অস্ত্র তৈরি করছিল, সে সম্পর্কে ট্রুম্যানকে কিছুই জানানো হয়নি।
কিউবায় ব্যর্থ ‘বে অভ পিগস’ আক্রমণের দায় নিজের ওপর নেওয়ার পর জন এফ কেনেডির জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। রোনাল্ড রিগ্যান ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারিতে নিজের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত নন দাবি করেও এতে জড়ানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, চূড়ান্ত দায়ভার আমার ওপরই বর্তায়।
২০০৯ সালের শুরুর দিকে শেষ সংবাদ সম্মেলনে জর্জ ডব্লিউ বুশ নিজের একাধিক ভুলের তালিকা তুলে ধরেছিলেন, যার মধ্যে ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টিও ছিল। বারাক ওবামা যখন তার স্বাস্থ্য বিষয়ক শীর্ষ পদের মনোনীত প্রার্থী টম ড্যাশল বকেয়া কর অনাদায়ের কারণে নাম প্রত্যাহার করে নেন, তখন প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আমি ভুল করে ফেলেছি।
অ্যানস্লোভার বলেন, ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত প্রকৃত অর্থেই দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। কিন্তু ট্রাম্পের কথা হলো, ‘আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে এক বিশাল দুর্যোগ বা বিপর্যয় পেয়েছি।’ সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে ভোটাররা ক্ষুব্ধ। তবে তিনি বলেন, জনগণ তার ওপর ক্ষুব্ধ নয়, বরং কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের ওপর চটে আছেন।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, নভেম্বরের পর তার দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে। তবে তিনি আরও জানান, রিপাবলিকানরা যদি হেরে যায়, তবে সেটি তার দোষ হবে না। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেও একই কথা বলেছিলেন। সেবারও তিনি বলেছিলেন, তার দল প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে তিনি তার দায় নেবেন না এবং শেষ পর্যন্ত দল হেরেও গিয়েছিল।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের জরিপ অনুযায়ী, অর্থনীতির মতো একটি বিষয়, যাকে একসময় ট্রাম্পের অন্যতম শক্তিশালী দিক মনে করা হতো, সে ক্ষেত্রে তার সমর্থনের হার ক্রমান্বয়ে কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চে তার জনসমর্থন ৪০ শতাংশ থাকলেও জুলাইয়ে ৩২ শতাংমে নেমে এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ৬ জনই বলছেন, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিগুলো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রিপাবলিকান জনমত জরিপকারী ফ্রাঙ্ক লুনৎস বলেন, জনসাধারণ অবশ্যই প্রত্যাশা করে, প্রেসিডেন্ট জীবনযাত্রাকে আরও সাশ্রয়ী করার বিষয়ে মনোযোগী হবেন এবং এটি নিয়ে উদ্বেগ দেখাবেন। ট্রাম্প অবশ্য এর বদলে বাইডেনের দিকে আঙুল তুলছেন। ২০২২ সালে বাইডেন ক্ষমতায় ছিলেন। তখনও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর মহামারির প্রভাব ছিল। ওই সময় মূল্যস্ফীতি হার ৯.১ শতাংশ হয়। এর মাধ্যমে চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল।
পরে ২০২৪ সালের নভেম্বরের মধ্যে তা কমে ২.৭ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের চাপে গত মাসে মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়ে ৩.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, আমরা যখন ক্ষমতা হাতে নিই, তখন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলাম সম্পূর্ণ এক বিপর্যয়। তিনি আরও বলেন, আসলে ওই চড়া দাম (মূল্যস্ফীতি) উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলাম।
ডেমোক্র্যাটিক কৌশলবিদ ও বাইডেনের সাবেক হোয়াইট হাউস মুখপাত্র অ্যান্ড্রু বেটস বলেন, প্রথম দিনেই মূল্যস্ফীতি দ্রুত বা তাৎক্ষণিকভাবে শেষ করার যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, সে কথা তিনি এখন আর মুখে আনেন না। ইরান ইস্যু ও লিংকন মেমোরিয়াল রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কার সংক্রান্ত ঘটনায় ট্রাম্পকে ঠিক একই ধরনের আচরণ করতে দেখা গেছে। ইরান যুদ্ধকে একটা ‘ছোট ভ্রমণ’ বা ‘পথ পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প।
এ যুদ্ধ কত দিন ধরে চলছে, তা চেপে যাওয়ার জন্য তিনি প্রায়ই বলেন যে ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে আমেরিকার যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে গড়িয়েছিল। তিনি যদিও শুরুতে বলেছিলেন, ইরান সংঘাত চার-পাঁচ সপ্তাহে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এ যুদ্ধ এখন ছয় মাসে গড়িয়েছে এবং এর কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
রিফ্লেক্টিং পুলের ক্ষেত্রে ট্রাম্প অতীত প্রশাসনের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন এবং মিথ্যা দাবি করেছেন যে বাইডেন ও ওবামা এটি মেরামতের ব্যর্থ চেষ্টা করে ‘শত শত মিলিয়ন ডলার’ অপচয় করেছিলেন। তবে ট্রাম্পের প্রধান আত্মরক্ষার যুক্তি ছিল নাশকতার অভিযোগ তোলা। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন অলিম্পিক ক্যানোয়ারের বিরুদ্ধে করা সবচেয়ে আলোচিত মামলাসহ চারটি মামলা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে